ঘটনাটি আমি প্রথম বাসায় জানাতে চাইনি। জুলাই অভ্যুত্থানে আহত হওয়ার ঘটনা কতক্ষণ চাপা থাকে। যা ভেবেছি তাই। বাসায় খবরটি জেনে গেছে আমি জানানোর আগেই। ঘটনাটি বিকেলে ঘটলেও সন্ধ্যায় বাসা থেকে স্ত্রীর ফোন আসে। মোবাইল রিসিভ করেই ওপাশের কণ্ঠ অন্যরকম, কী হয়েছে! কোথায় গুলি লেগেছে? তোমার অবস্থা এখন কেমন.... আরও কত কি। এপাশ থেকে আমি বেশি কিছু বলতে পারলাম না, শুধু বলেছি- ‘না তেমন কিছু না। আমি ভালো আছি- অফিসে আছি। সামান্য আহত হয়েছি। হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছি। সহকর্মীরা আমাকে পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। চিন্তা করো না’।
কিন্তু কে শোনে কার কথা? ওপাশ থেকে শুনতে পাচ্ছি-আমার দুই মেয়ের কান্নাজড়িত কণ্ঠ। ‘বাবা-বাবা, কোথায় তোমার ওপর হামলা করেছে। বড় মেয়ে নাবিহা বলল, ‘বাবা সত্যি করে বলো- তুমি কি আসলেই অফিসে নাকি হাসপাতালে? শুনেছি তোমার পায়ে গুলি লেগেছে। এ অবস্থায় নিশ্চয়ই তুমি অফিসে না। আমাদেরকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিচ্ছো’। এসব নানান প্রশ্ন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফোন আসতেছে বিভিন্ন স্থান থেকে। আমি কয়জনের ফোন রিসিভ করবো; কী বলবো? আর কতজনের সাথে সত্য আড়াল করে রাখবো। ঘটনা তো ঘটেছে। আমি আহত হয়ে অফিসে এসে নিয়মিত কাজ না করতে পারলেও চেয়ারে বসে আছি।
ঘটনাটি ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের শেষের দিকের। ১৯ জুলাই বিকাল তিনটার দিকে পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাসা থেকে বেরিয়েছি। রাজধানীর আফতাবনগরে তখন আমার বাসা। একই এলাকায় প্রায় ১৮ বছর ধরে থাকায় স্থানীয় অনেকেই বেশ পরিচিত। পরিচিত হওয়ায় তুমুল আন্দোলন চললেও সেদিন ওই এলাকা দিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হতে পেরেছি। রাজধানীজুড়ে সেদিন বড় আন্দোলন। সারাদেশ অচল। ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সেদিন থেকেই গণ-অভ্যুত্থানের দিকে মোড় নেয়। টিভিতে খবর দেখে অফিসে যাওয়ার জন্য সেদিন বাসা থেকেই বাধা দিয়েছিল। বাসা থেকে বলা হয়-কয়েকদিন ছুটি নিতে। কেননা বাইরে বের হলে জীবনের ঝুঁকি আছে। আজ ঢাকা মনে হচ্ছে রণক্ষেত্র। টিভিতে লাইভ চলছে। সারা ঢাকা জ¦লছে। রামপুরা বিটিভি ভবনের ভেতরে আগুন দেয়া হয়েছে, বিটিভির সামনে রামপুরা সড়কে যুদ্ধ পরিস্থিতি। ছাত্র-জনতা ঘেরাও করে রাখছে বিটিভি ভবন। ওদিকে রামপুরা ব্রিজ থেকে মধ্যবাড্ডা পর্যন্ত পুলিশ-বিজিবির সঙ্গে ছাত্রজনতার থেমে থেমে লড়াই; খন্ড খন্ড যুদ্ধক্ষেত্র। বিশেষ করে বেসরকারি ব্র্যাক ও ক্যানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির সামনে পুলিশের সাথে ছাত্র-জনতার দফায় দফায় সংঘর্ষ। আন্দোলনকারীদের লক্ষ করে মুহুর্মুহু গুলি ছোড়ছে পুলিশ। পাল্টা ধাওয়া দিচ্ছে ছাত্রজনতাও। স্বৈরশক্তি কখনো মাতৃভূমি রক্ষাকারী দেশপ্রেমিক জনতার সামনে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারে না। ইতিহাস তা বলে না। ইতিহাস এ কথাই বলে-অপশক্তি সামান্য সময়ে শক্তি প্রদর্শন করলেও জনতার সামনে তারা একসময় পরাজিত হতে বাধ্য। জুলাই বিপ্লব ছিল প্রিয় বাংলাদেশকে অপশক্তি থেকে মুক্ত করার আন্দোলন। বাংলাদেশের জন্য আরেক স্বাধীনতার লড়াই। নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন। বাংলদেশকে দ্বিতীয়বার স্বাধীন করার প্রত্যয় নিয়ে যারা মাঠে নেমেছে তারা জীবনের কথা ভাবেনি। রাজপথে জীবন বিলিয়ে দিতে সেদিন রাজধানীসহ সারাদেশে লক্ষ জনতা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। আর ফ্যাসিস্ট সরকার গদি বাঁচাতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকে সেদিন লেলিয়ে দিয়েছিল মাতৃভূমি রক্ষাকারী ছাত্র-জনতাকে দমনে। পুলিশ সেদিন নির্বিচারে গুলি চালিয়ে পাখির মতো হত্যা করেছে কয়েকশ মানুষকে। জীবন দিয়েছে অবুঝ শিশুরা। নিজ ঘরের বারান্দায় খেলা করতে থাকা শিশুটিও রক্ষা পায়নি। গুলি চালানো হয় পুলিশের ভয়ে বাড়ির কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণের ওপরও। কতটা মর্মান্তিক! এমনই এক রণাঙ্গনে মাঠে ছিলাম আমি। একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে, সচেতন একজন নাগরিক হয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হতে মাঠে ছিলাম। যদিও বার বার বাসা থেকে আমাকে সেদিন অফিসে যেতে নিষেধ করা হয়। বাসা থেকে বলা হয়েছিল জীবনের চেয়ে বড় কিছু নেই। আগে নিজে বাঁচতে হবে তারপর চাকরি-অন্য কিছু। কিন্তু সেদিন শুনেনি কারও কথা।
নিজের মোটরসাইকেলটি নিয়ে বেরিয়ে গেলাম রাজপথে। কয়েকটি স্থানে কোনো অবস্থায় মোটরসাইকেল নিয়ে যেতে পেরেছি। কেননা ঢাকার অধিকাংশ সড়কই ছিল অবরোধ করা। গাছের গুড়ি ফেলে, টায়ার জ¦ালিয়ে বিক্ষোভ করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। দেখলাম কোনো সড়ক দিয়েই মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আর আন্দোলন এমন পর্যায় ছিল যে সাংবাদিক পরিচয় পেয়েও আমাকে কয়েকটি স্থানে আটকে দেয়া হয়। তারা বলেছে-রাস্তায় গাড়ি চলাচল করতে দিচ্ছি না। এ অবস্থায় আপনার মোটরসাইকেল চললে অন্যদেরও ছেড়ে দিতে হবে। তাদের সাথে আমিও একমত। তারপরও প্রেস বলে কথা। ওরাও চাচ্ছে-গণমাধ্যম পক্ষে থাকুক। গণমাধ্যমে জুলাই আন্দোলনের সঠিক চিত্র ফুটে উঠুক। কিন্তু এখানেও সমস্যা। হাতেগোনা দু’একটি ছাড়া তখনও অধিকাংশ গণমাধ্যমের ফ্যাসিবাদের পক্ষে অবস্থান ছিল। তখনও হাসিনা রেজিমের গণমাধ্যমগুলো সক্রিয় ছিল। ছাত্রজনতার আন্দোলনের বিপক্ষেই খবর প্রচার করছিল। আন্দোলনকারীদের তারা জঙ্গি তকমা দিয়ে খবর প্রচার করছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলের সেসব গণমাধ্যমের খবরে ছাত্রজনতা চরম ক্ষুব্ধ ছিল। তারা গণমাধ্যমের কাউকে দেখলেই ফ্যাসিবাদের এজেন্ট মনে করতো। এ কারণে সঠিক ধারার গণমাধ্যমে আমরা যারা ছিলাম আমাদেরও কখনো কখনো রেষানলে পড়তে হয়েছে। যদিও আমি নিজে আন্দোলনকারী ছাত্রজনতাকে ভিন্ন কৌশলে ম্যানেজ করে সামনে এগিয়ে যেতে পেরেছি। ওরা আমাকে বাধা দিয়ে কোথাও আটকাতে পারেনি।
তারপরও কেন বিপত্তি? এখনেই প্রশ্ন। ছাত্রজনতার মাঝেও ছদ্মবেশে রাজপথে ছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনার দল (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ দলটির নেতা-কর্মীরা। ছদ্মবেশে কারা ছাত্রলীগ, যুবলীগ তা জানা ছিল না। তখন বিকেল চারটার মতো। হাতিরঝিল সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলাম। পেছনে হাতির ঝিলেও খন্ড খন্ড বিক্ষোভ-অবরোধে আমাকে বাধা দিলেও সামনে যেতে এগিয়ে যেতে পেরেছি। কিন্তু সমস্যা হয় মধুবাগ ব্রিজের অদূরে হাতিরঝিল সড়কের বিক্ষোভরত এলাকায়। আমাকে হঠাৎ ২০/৩০ জনের একদল যুবক ঘিরে ধরে। তাদের আচরণ ছিল উশৃঙ্খল। ছাত্রজনতার বিক্ষোভকারী মনে করে ওদেরকেও আমি বলেছিলাম- আমি তো আন্দোলনের পক্ষে-আমাকে আটাকনোর কারণ নেই। সাংবাদিক পরিচয় দিলাম। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ওরা মারমুখী হয়ে ওঠে। ওরা ছাত্রজনতার আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে আমার ওপর চড়াও হয়। যা ভেবেছি তাই- ওরা আমাকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে মোটরসাইকেল কেড়ে নিতে চাইলো। আমাকে ধাক্কা দিয়ে হেলমেট, মানিব্যাগ, মোটরসাইকেলের চাবি কেড়ে নিল। আমার ওপর হামলা চালালো। এ অবস্থা দেখে আমাকে রক্ষা করতে দূর থেকে আন্দোলনকারী ছাত্রজনতা ছুটে আসলে দুই পক্ষের মধ্যেই বেধে যায় সংঘর্ষ। এসময় হাতিঝিলের দুই পাশের সড়কজুড়ে দায়িত্বরত দেখা গেছে বর্ডারগার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের। আমার সাথে সংঘর্ষ চলাকালে হঠাৎ আকাশ থেকে হেলিকপ্টার উড়ে যাওয়ার শব্দ শোনা গেল। এরই মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা ওদের কাছ থেকে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করে আমাকে বলল-দ্রুত সরে যান। এসময় আকাশ থেকে ছোড়া হলো গুলি। মাথায় আমার হেলমেট নেই। উপর থেকে পিচঢালা সড়কে চটচট গুলির শব্দ। সামনে পেছনে চটচট শব্দ। হেলমেট না থাকায় মাথায় গুলি পড়ার ভয়ে মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে দ্রুত পিকআপ চেপে মোটরসাইকেল নিয়ে সামনের দিকে ছুটেছি। শরীর রক্তাক্ত। বাম পায়ের হাঁটুর নিচে ক্ষত-রক্তাক্ত। মনে হলো হাঁটুর নিচে গুলির চিহ্ন। দৈনিক সংগ্রামের গেট পর্যন্ত আসলাম কোনো রকম। এ অবস্থা দেখে কয়েকজন সহকর্মী দ্রুত আমাকে পার্শ্ববর্তী ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে নিয়ে যায়।
এরই মধ্যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত এলো। আমি খবরটি অফিসের বাইরে কাউকে না জানালেও একজনকে জানিয়েছিলাম। বড় ভাইয়ের মতো সম্মান করি তাকে। তিনি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সিনিয়র কর্মকর্তা। তিনি জানেন না যে এ ঘটনা আমি নিজের বাসায় বা পরিবারের কাউকে জানাইনি। প্রিয় ভাইটি, খবরটি প্রথমে জানান তার স্ত্রীকে। ভাবি ফোন দিয়ে হঠাৎ আমার স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে তার কাছ থেকেই ঘটনা যেনে যায়। এরপর বাসার সবাই এবং স্বজনদের কাছে খবর চলে গেল। সবাই উদ্বিগ্ন। এদিকে আফতাবনগর ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি কেন্দ্রিক আন্দোলন ছড়িয়ে যায় সেদিন আমার বাসার চারপাশেও। তাই বাসার সবাই চিন্তিত; আমি আহত হলেও সেই রাতে অফিস থেকে যেনো আর বাইরে বের না হই। অফিসেই যেনো রাতে থেকে যাই। কারণ পায়ে ব্যান্ডেজ, গুলিবিদ্ধ হয়ে হাঁটতে সমস্যা। মাথা ও দুই হাত রক্তাক্ত, যখমের চিহ্ন। পুলিশ-র্যাব, বিজিবি কিংবা ফ্যাসিস্টের সহযোগীরা আমাকে রাস্তা থেকেই ধরে নিয়ে যেতে পারে সেই ভয়ে। তাই আমাকে নিয়ে উদ্বেগের মাঝেও বার বার বাসা থেকে সিদন বলা হয়- এই রাতে যেনো অফিস থেকে একা একা বাসায় না আসি। তাদের চিন্তা আমি আহত হলেও বেঁচে আছি-কিন্তু এই অবস্থায় রক্ত পিপাসুদের সামনে পড়লে আর রক্ষা হবে না। গুম হওয়ার আশঙ্কায় বার বার আমার মেয়ে আমাকে ফোন করে বলেছিল- ‘বাবা তুমি আজ রাতে বাসায় এসো না, রাত পোহালে দিনের বেলা যেভাবে পারো আসবে’। তবে সেদিনই মনে হয়েছিল দেশ ফ্যাসিবাদ মুক্ত হবে। রাজধানীসহ সারাদেশে সেদিন থেকেই সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের জন্য। এরই ধারাবাহিকতায় পাঁচ আগস্ট ছাত্রজনতার অভ্যুত্থান ঘটে। আর কারো কথা না শুনে আমি গভীর রাতে পথ পরিবর্তন করে ভিন্ন কৌশলে আহত অবস্থায় বাসায় ফিরে আসি।
লেখক:
চিফ রিপোর্টার, দৈনিক সংগ্রাম