এ্যাডভোকেট আবু হাসিন

শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়। আর শিক্ষার মেরুদণ্ড হচ্ছে শিক্ষক সমাজ। বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই শিক্ষকদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও মর্যাদা দেওয়া হলেও আমাদের দেশ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। কারণ, আমাদের শিক্ষা অবকাঠামোতে শিক্ষকরা আজো অবহেলিত ও অধিকার বঞ্চিত। ফলে মেধাবীরা এ পেশায় খুব একটা আসতে চান না। তারা সুযোগ পেলেই অন্যকোন পেশায় চলে যান। একান্ত বাধ্য না হলে কেউ শিক্ষকতায় থাকতে চান না।

শিক্ষকদের সর্বোচ্চ মেধার অধিকারী হওয়া প্রয়োজন হলেও কাক্সিক্ষত সম্মান ও সুযোগ-সুবিধার অভাবেই তারা এ পেশার সাথে নিজেদের মেনে নিতে পারেন না। এছাড়াও আমাদের দেশে শিক্ষকদের নানাভাবে বিভক্ত করে রাখা হয়েছে। একটা অংশ সরকারি, আবার অপর অংশ বেসরকারি। সরকারি তথা রাজস্ব খাতের শিক্ষকদের বেতন সহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা এক রকম, আবার বেসরকারি বা এমপিওভুক্ত তথা উন্নয়ন খাতের সুযোগ সুবিধা সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা একই পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকে একই বিষয়ে পাঠদান করলেও সুযোগ-সুবিধায় রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। এছাড়াও শিক্ষকদের বিশাল একটি অংশ সকল প্রকার সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এরা স্থানীয় জনগণের অনুগ্রহ নির্ভর। শ্রেণিভেদে শিক্ষকদের সাথে রাষ্ট্রের এমন বৈষম্য কোন ভাবেই কাম্য নয় বরং দেশ ও জাতির জন্যই দুর্ভাগ্যের।

অবশ্য আজ আমরা বেসরকারি এমপিওভুক্ত সুযোগ-সুবিধা নিয়েই কথা বলবো। আসলে আমাদের দেশের বেসরকারি শিক্ষকদের সমস্যাগুলো বহুমুখী ও দীর্ঘদিনের। বৈষম্যমূলক বেতন কাঠামো, চাকরির স্থায়িত্ব নিয়ে সমস্যা এবং নানা রকম প্রশাসনিক জটিলতায় তাদের দৈনন্দিন জীবন কঠিন ও সমস্যাসঙ্কুল। একই যোগ্যতা এবং একই দায়িত্ব পালন করা সত্ত্বেও সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বিস্তর তফাৎ দৃশ্যমান। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা জাতীয় বেতন স্কেল পেলেও তাদের বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা খুবই নগণ্য। এছাড়া অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির বাইরে থাকায় শিক্ষকরা নামমাত্র বেতনে বা বিনা বেতনেই কাজ করতে বাধ্য হন। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ কমিটি ও পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনেক সময় শিক্ষকদের চাকরিকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেয়। অবসর গ্রহণের পর কল্যাণ ট্রাস্ট এবং অবসর সুবিধা বোর্ডের টাকা পেতে শিক্ষকদের বছরের পর বছর হয়রানি ভোগ ও অপেক্ষা করতে হয়। সরকারি শিক্ষকদের মতো স্থায়ী পেনশন বা পর্যাপ্ত গ্র্যাচুইটি সুবিধা তাদের নেই। স্থানীয় প্রভাবশালী ও স্কুল পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক অনেক সময় শিক্ষকদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে সামান্য বেতনে সংসার চালাতে না পারায় অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করেন, যা তাদের সামাজিক মর্যাদার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিষয়গুলো নিয়ে প্রায়ই শিক্ষক সংগঠনগুলো জাতীয়করণসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে মাঠের আন্দোলনে নামে। কিন্তু সমস্যার কোন সমাধান হয় না। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকার সহ কর্তৃপক্ষ সব সময়ই উদাসীন।

বেসরকারি শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হন অবসর গ্রহণের পর। তাদের কোন পিআরএল নেই। তাই তারা খালি হাতে অবসর গ্রহণ করলে কল্যাণ তহবলি সহ অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা পেতে নানাবিধ ভোগান্তির শিকার হন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই ঝুলে রয়েছে অবসরে যাওয়া বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ভাতার লক্ষাধিক আবেদন। কিন্তু সরকারের কোষাগারে ফান্ড সঙ্কটের কারণে কোনো ভাতাই পাচ্ছেন না তারা। সূত্র বলছে বেসরকারি শিক্ষকরা তাদের নিজেদের গচ্ছিত টাকাই এখন পাচ্ছেন না। এ প্রাপ্য টাকার জন্য ধুঁকছেন ৮০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী। অতি জরুরির তাগিদ দিয়ে দাখিল করা ৬০ হাজারের বেশি আবেদন নিষ্পত্তির কার্যকর কোনো উদ্যোগও এতদিন ছিল না। যদিও অবসর সুবিধা বোর্ডে ৯ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকার দায় নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। তবে সম্প্রতি এ সঙ্কট নিরসনে সরকারের নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।

ভুক্তভোগীরা জানাচ্ছেন, চাকরি জীবনের শেষ দিনে অবসর সুবিধার অর্থ হাতে পাওয়ার স্বপ্ন দেখেন প্রত্যেক শিক্ষক। কিন্তু বাস্তবে অবসরে যাওয়ার পর বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও প্রাপ্য অর্থ পাচ্ছেন না দেশের হাজারো এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী। অনেকে নানা রোগবালাই কিংবা দুরারোগ্য কোনো অসুখে মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে যায় কিন্তু অবসর ভাতার টাকা হাতে পান না। কোন কোন ক্ষেত্রে টাকার অভাবে শেষ জীবনে প্রয়োজনীয় ওষুধও কিনতে পারেন না। দীর্ঘ দিনের তহবিল সঙ্কট ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অবসর সুবিধা এখন অনেকের কাছে এক অনিশ্চিত প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে বর্তমানে মোট ৮০ হাজার ৩২০টি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এসব আবেদন নিষ্পত্তিতে প্রয়োজন প্রায় ৯ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৫৯ হাজার ৮২০টি আবেদন এখনো ঝুলে আছে, যার জন্য প্রয়োজন ৭ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। এ বিপুল সংখ্যক আবেদন জমে যাওয়ার ফলে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেকেই অবসরের দুই থেকে পাঁচ বছর পরও অর্থ পাননি। ফলে চিকিৎসা, সংসার ব্যয় ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, অবসর সুবিধা বোর্ড ও শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের মূল অর্থায়ন আসে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে কেটে রাখা চাঁদা থেকে। কিন্তু আবেদন ও দায়ের পরিমাণ দ্রুত বাড়লেও তহবিলের আয় সে হারে বাড়েনি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, কল্যাণ ট্রাস্টের বার্ষিক আয় প্রায় ৬৬০ কোটি টাকা হলেও ব্যয় প্রায় ৮৪০ কোটি টাকা। ফলে প্রতি বছর প্রায় ১৮০ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অর্থসঙ্কটের কারণেই অবসর সুবিধা প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক সভায় এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় অবসর সুবিধার বিপুলসংখ্যক আবেদন দীর্ঘদিন ঝুলে থাকায় অসন্তোষ জানানো হয় এবং মাসভিত্তিক আবেদন নিষ্পত্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের নির্দেশ দেয়া হয়।

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সংগঠনগুলোর দাবি, চাকরিজীবনে নিয়মিত চাঁদা কেটে রাখা হলেও অবসরের পর প্রাপ্য অর্থ পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। অনেক শিক্ষক বাধ্য হয়ে ঋণ নিচ্ছেন, কেউ চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে সম্পদ বিক্রি করছেন। সামাজিক নিরাপত্তার যে উদ্দেশ্যে অবসর সুবিধা চালু হয়েছিল, বাস্তবে তা ব্যাহত হচ্ছে। এ দিকে দীর্ঘদিনের এই সঙ্কট নিরসনে সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। সংসদে দেয়া তথ্যে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ২০ হাজার ৫০০টি আবেদন নিষ্পত্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য দু’হাজার ৪৬২ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৬ হাজার আবেদন নিষ্পত্তি করে ৭০০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

অপর দিকে অবসর সুবিধা ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করতে ২০২৬ সালে অবসর সুবিধা আইন সংশোধন করা হয়েছে। নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রশাসনিক কাঠামো ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সরকার অনলাইন আবেদন ব্যবস্থাও শক্তিশালী করেছে। অবসর সুবিধা বোর্ডের অনলাইন আবেদন ব্যবস্থা এখন ই-বিএআইএস প্ল্যাটফর্মের সাথে সংযুক্ত। ফলে আবেদন যাচাই ও সরাসরি ব্যাংক হিসাবে অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। সর্বশেষ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের বকেয়া নিষ্পত্তির জন্য প্রায় ৯ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়নের সুপারিশের খবরও সংশ্লিষ্ট মহলে আশার সঞ্চার করেছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কয়েক দশক অবদান রাখা একজন শিক্ষক অবসরের পর প্রাপ্য অর্থের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করবেন এটি গ্রহণযোগ্য নয়। জমে থাকা আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি, তহবিলের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অর্থ পরিশোধের আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় অবসর সুবিধা বোর্ডে নতুন আইন ও নতুন উদ্যোগ এলেও হাজারো শিক্ষক-কর্মচারীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান হবে না।

ইতোমধ্যে এতসব হতাশা আর সঙ্কটের মধ্যেও শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত প্রায় ৬৫ হাজার শিক্ষকের পেনশনের টাকা দেয়া আগস্ট মাসে শুরু হবে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে শিক্ষা বোর্ড, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় সভায় এ তথ্য জানান তিনি। মন্ত্রী জানিয়েছেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে চলতি বাজেটে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একই সাথে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় দু’ হাজার কোটি টাকার একটি বন্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর আওতায় আগস্ট মাস থেকে প্রায় ৬৫ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে পেনশনের টাকা দেয়া শুরু হবে। এ সুবিধা ধাপে ধাপে প্রায় দুই লাখ পেনশনভোগীর মধ্যে সম্প্রসারণ করা হবে।

দেশের অধিকাংশ শিক্ষকদের অভিযোগ চাকরিজীবনে নিয়মিতভাবে বেতন থেকে অবসর সুবিধা ও কল্যাণ তহবিলের জন্য অর্থ কেটে রাখা হলেও অবসরের পর সে টাকা পেতে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও তহবিল সঙ্কটের মুখে পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে আবেদন নিষ্পত্তি হতে দুই থেকে চার বছর পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে নির্ধারিত হারে অর্থ কেটে অবসর তহবিল গঠন করা হয় এবং সেখান থেকেই অবসরকালীন সুবিধা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু তারপরও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা সময়মত অবসরকালীন আর্থিক সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে অমানবিক জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষক সমাজের সাথে এমন অমানবিক আচরণ কোন ভাবেই কাম্য নয়। তাই সবার আগে শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তা করতে গেলে সবার আগে প্রয়োজন শিক্ষা জাতীয়করণ। আর অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষরা যাতে অবসর গ্রহণের দিনেই তাদের প্রাপ্য বুঝে পান তা নিশ্চিত করতে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। আর বেসরকারি শিক্ষকদের দায় মেটাতে এখানে সরকারের বরাদ্দবৃদ্ধিও সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। জীবন সায়াহ্নে এসে শিক্ষকদের সাথে এমন অমানবিক আচরণ কোন ভাবেই কাম্য নয়।

লেখক : আইনজীবী ও প্রাবন্ধিক।