অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১২ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেছেন। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট কেমন হবে তা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা চলছিল। বিশেষ করে চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক অঙ্গনে যে পরিবর্তন সূচিত হওয়ার মাধ্যমে যে গণআকাক্সক্ষার সৃষ্টি হয়েছে বাজেটে তা কিভাবে প্রতিফলিত হয় সেটাই ছিল বিবেচ্য বিষয়। প্রতিবছরই বাজেটের আকার বড় হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে প্রস্তাবিত বাজেট আকারের দিক থেকে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এ পর্যন্ত মোট ৬৫টি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে আকারের দিক থেকে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রণীত বাজেটই সবচেয়ে বড়। বাজেটে আয়-ব্যয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিকভাবে বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে যে ঘাটতির পরিমাণ দেখানো হয়েছে তা মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। একটি দেশের জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাজেট ঘটতি গ্রহণীয় বলে মনে করা হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয়বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা খুবই কম। প্রতি বছরই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয়বরাদ্দ এক পর্যায়ে কমিয়ে আনা হয়।

আগামী অর্থবছরের (২০২৬-২০২৭) জন্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবার তেমন কোন সম্ভাবনা নেই। রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির জন্য উচ্চহারে করারোপের পরিবর্তে বিদ্যমান করহার যৌক্তিকভাবে কমিয়ে আনার পাশাপাশি করজাল বিস্তৃত করতে হবে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কোন বছরই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কর আদায় করা সম্ভব হয় না। চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২০২৬) প্রথম ৯ মাসে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রজস্ব আদায়ে ঘটিতে হয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। আগের বছরে পুরো অর্থবছরের এক লাখ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি পড়েছিল। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে প্রত্যাশিত মাত্রায় কর আদায় করা সম্ভব হবে না। বর্তমানে বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ৬দশমিক ৮ শতাংশ। সেখান থেকে একবছরের ব্যবধানে আগামী অর্থবছরে ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ৯দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটা বিদ্যমান অবস্থায় অর্জনযোগ্য নয় বলেই মনে হচ্ছে। এক যুগ আগেও ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। বাংলাদেশের মতো বিকাশমান একটি অর্থনীতিতে ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ১২ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ হওয়া উচিত। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে ট্যাক্স আদায় বাড়ানোর জন্য সুনির্দিষ্ট কোন পদক্ষেপ ঘোষণা করা হয়নি। ট্যাক্স আদায় বাড়ানো না গেলে সরকারকে উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক ব্যয় মেটানোর জন্য বর্ধিত হারে ঋণ গ্রহণ করতে হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার অভ্যন্তরীণ সূত্র, বিশেষ করে ব্যাংকিং সেক্টর থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করবে। এছাড়া সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ঋণ নেয়া হবে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বিদেশি ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ০৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। অনুদান পাওয়া যাবে ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। ব্যাংকিং সেক্টরের অবস্থা অনেক দিন ধরেই ভালো যাচ্ছে না। অধিকাংশ ব্যাংক গ্রাহকদের আমানতকৃত অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। বাংলাদেশ ইসলামি ব্যাংক নিয়ে এক ধরনের টানাপোড়েন চলছে। ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা তাদের সঞ্চিত অর্থ তুলে নিচ্ছে। এই অবস্থায় সরকার আগামী অর্থবছরে ব্যাংকিং সেক্টর থেকে যদি ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে তাহলে ব্যাংকগুলোর ঋণদান সক্ষমতা আরো কমে যাবে। অন্যদিকে বিদেশি সূত্র থেকে চাহিদাকৃত ঋণ ও অনুদান পাবার ক্ষেত্রে সংশয় রয়েছে। স্থানীয়ভাবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সরকার ইচ্ছে করলেই বেশি পরিমাণে ঋণ গ্রহণ করতে পারবে না।

সরকার আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি’র আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য মোতাবেক, চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২০২৬) বাংলাদেশের জিডিপি’র আকার দাঁড়িয়েছে ৫০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মাথাপিছু গড় জাতীয় আয় ৩ হাজার ২০ মার্কিন ডলারে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপি’র আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে হলে আগামী ৮ বছরে গড়ে ৮ থেকে ৯ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। প্রাইভেট সেক্টরে প্রতিবছর ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেট সম্পর্কে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধি দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যথার্থই মন্তব্য করেছে, এই বাজেট অধিক ঋণ নির্ভর, উচ্চাভিলাষী, অবাস্তবায়নযোগ্য এবং লুটপাটের।