জুলাই কেবল একটি মাসের নাম নয়; এটি একটি জাতির আত্মজাগরণ, আত্মসমালোচনা এবং নতুন রাষ্ট্রচিন্তার প্রতীক। ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন জনগণ রাষ্ট্রকে তার মৌলিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তখন মানুষ কেবল সরকার পরিবর্তনের দাবি তোলে না; তারা রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন, ন্যায়বিচারের ভিত্তি এবং ক্ষমতার ব্যবহারের নীতিমালারও পরিবর্তন প্রত্যাশা করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই সে ধরনেরই একটি অধ্যায়, যা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে-আমরা কেমন রাষ্ট্র চাই?

এ প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞান, নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হয় না কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মেগা প্রকল্প কিংবা পরিসংখ্যানগত অর্জনের মাধ্যমে। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, প্রশাসনের জবাবদিহি, নাগরিকের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষার সক্ষমতায়। যে রাষ্ট্রে একজন সাধারণ মানুষ আইনের সমান আশ্রয় পায়, সেখানেই প্রকৃত উন্নয়নের ভিত্তি নির্মিত হয়।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং বিভিন্ন সময়ের গণআন্দোলন একটিই বার্তা দিয়েছে- মানুষ স্বাধীনতা যেমন চায়, তেমনি চায় ন্যায়বিচার। কারণ স্বাধীনতা যদি ন্যায়বিচারবিহীন হয়, তবে তা ধীরে ধীরে বৈষম্য, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবিচারের কাছে পরাজিত হয়। সেই কারণেই জুলাইয়ের চেতনার মূল দর্শন হওয়া উচিত একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে ন্যায়ের মর্যাদা বেশি হবে।

জুলাইয়ের চেতনা কোনো ব্যক্তি, দল বা রাজনৈতিক মতাদর্শের একচেটিয়া সম্পদ নয়। এটি জাতীয় চেতনার অংশ। এই চেতনার মূল কথা হলোÑ রাষ্ট্র জনগণের, রাষ্ট্রক্ষমতা জনগণের আমানত এবং সে ক্ষমতার প্রয়োগ হবে সংবিধান, আইন ও নৈতিকতার আলোকে।

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর কিন্তু গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (OHCHR)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হয়েছেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের অনেকেই গুলিবিদ্ধ বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার হন।

এই আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে আছেন রংপুরের শহীদ আবু সাঈদ, যার মৃত্যু আন্দোলনকে নতুন গতি দেয়। একইভাবে মীর মুগ্ধ, ওয়াসিম আকরাম, ফারহান ফাইয়াজ, শহীদ রিদয়, সাঈদুর রহমানসহ অসংখ্য শিশু ও কিশোর, ছাত্র, তরুণ, শ্রমজীবী ও সাধারণ নাগরিক তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রত্যাশায়।

জুলাইয়ের আত্মত্যাগের ইতিহাসে কিছু ঘটনা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে জাতির বিবেককে আজও নাড়া দেয়। তেমনি এক অনন্য দলিল শহীদ আনাসের মায়ের উদ্দেশে লেখা চিঠি। সেই চিঠিতে ফুটে উঠেছে একজন সন্তানের দেশপ্রেম, আদর্শের প্রতি অঙ্গীকার এবং মায়ের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা। মৃত্যুর আশঙ্কা জেনেও ন্যায় ও সত্যের পক্ষে অবিচল থাকার যে প্রত্যয় তিনি ব্যক্ত করেছিলেন, তা আজও মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে।

তাঁদের রক্তের ঋণ কেবল স্মরণসভা, শোকবার্তা বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের মাধ্যমে শোধ হবে না; প্রকৃত সম্মান জানানো হবে তখনই, যখন রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, বিচার হবে নিরপেক্ষ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা হবে, জনগণের ভোটাধিকার ও নাগরিক মর্যাদা সুরক্ষিত থাকবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে ইনসাফ, জবাবদিহি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হবে। জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ জাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়- ন্যায়বিচারহীন উন্নয়ন টেকসই নয়, আর ইনসাফবিহীন রাষ্ট্র কখনো জনগণের প্রকৃত রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারে না।

একটি রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা সুউচ্চ সেতু-সড়ক দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলোÑ একজন সাধারণ নাগরিক কতটা নিরাপদ, কত দ্রুত বিচার পান, কতটা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারেন এবং রাষ্ট্রীয় সেবাগুলো কতটা বৈষম্যহীনভাবে পান। এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর না থাকলে উন্নয়নের সাফল্য অনেকাংশেই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

গত দুই দশকে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, রপ্তানি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সাফল্য এসেছে। কিন্তু একই সঙ্গে দুর্নীতি, সুশাসনের ঘাটতি, প্রশাসনিক জটিলতা, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্নও সামনে এসেছে। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের আস্থা অর্জন করে।

পবিত্র কুরআন রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারকে সর্বোচ্চ নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে, তোমরা আমানত যথাযথভাবে তার হকদারের কাছে পৌঁছে দেবে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করবে।” (সূরা আন-নিসা: ৫৮)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে। ন্যায়বিচার কর; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।” (সূরা আল-মায়িদা: ৮)। এই নির্দেশনা স্পষ্ট করে যে, ইনসাফ কেবল ধর্মীয় উপদেশ নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতি।

ইসলামের রাষ্ট্রদর্শনে ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি বা দলের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি একটি আমানত। আমানতের অর্থই হলো জবাবদিহিতা। একজন শাসক যেমন জনগণের কাছে দায়বদ্ধ, তেমনি আল্লাহর কাছেও জবাবদিহি করতে বাধ্য। তাই যে রাষ্ট্রে ক্ষমতা জবাবদিহিহীন হয়ে পড়ে, সেখানে দুর্নীতি, বৈষম্য ও অবিচার অনিবার্য হয়ে ওঠে।

আজ বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সুশাসনের ঘাটতি। উন্নয়নের নানা সূচকে অগ্রগতি সত্ত্বেও মানুষ তখনই আশ্বস্ত হবে, যখন তারা দেখবে- আইনের চোখে সবাই সমান। রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তি এবং প্রান্তিক নাগরিক একই আইনের আওতায় আসছেন; অপরাধের বিচার রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে নয়, বরং আইনের ভিত্তিতে হচ্ছে। আইনের শাসনের অর্থ কেবল আইন প্রণয়ন নয়; বরং সেই আইন নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা একটি সভ্য রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বিচার যদি প্রভাবমুক্ত না হয়, তাহলে মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে রাষ্ট্র থেকে সরে যেতে থাকে। বিচার বিলম্বিত হওয়াও এক ধরনের অবিচার। তাই দ্রুত, নিরপেক্ষ ও সহজলভ্য বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র সংস্কারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। প্রশাসন কোনো রাজনৈতিক দলের নয়; প্রশাসন রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জনগণের করের অর্থে পরিচালিত হন। ফলে তাঁদের একমাত্র পরিচয় হওয়া উচিত পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা এবং জনসেবা। প্রশাসন যখন দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি বা অদক্ষতার শিকার হয়, তখন রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে হলে প্রশাসনকে দক্ষ, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করতে হবে।

দুর্নীতি আজ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়; বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেও ধ্বংস করে। দুর্নীতির কারণে জনগণের করের অর্থ অপচয় হয়, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পায়, কর্মসংস্থান ব্যাহত হয় এবং বৈষম্য আরও গভীর হয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই মানে কেবল কিছু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা নয়; বরং এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে দুর্নীতি করার সুযোগই ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে আসে। সরকারি ক্রয়, নিয়োগ, টেন্ডার, ব্যাংকিং, ভূমি প্রশাসন এবং সেবা খাতে প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি।

জবাবদিহিতা ছাড়া গণতন্ত্র কার্যকর হতে পারে না। নির্বাচিত প্রতিনিধি, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানÑ সবাইকে জবাবদিহির আওতায় থাকতে হবে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই যে, ক্ষমতা জনগণের অর্পিত দায়িত্ব; এটি কোনো ব্যক্তিগত অধিকার নয়। তাই ক্ষমতা যত বড় হবে, জবাবদিহির মানদণ্ডও তত কঠোর হওয়া উচিত।

একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অপরিহার্য। সমালোচনা রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়; বরং রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। সংবাদমাধ্যম, গবেষক, শিক্ষক, লেখক এবং নাগরিক সমাজের স্বাধীন ভূমিকা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। ভিন্নমতকে শত্রু মনে করার সংস্কৃতি সমাজকে বিভক্ত করে; আর সংলাপের সংস্কৃতি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে।

অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রের আরেকটি অপরিহার্য ভিত্তি। উন্নয়নের সুফল যদি কেবল সীমিত একটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তবে সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক এবং তরুণ কর্মজীবীদের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে না পারলে উন্নয়নের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। মূল্যস্ফীতি, আয়বৈষম্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবন যখন কঠিন হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রের নীতি আরও বেশি জনকল্যাণমুখী হওয়া প্রয়োজন।

কর্মসংস্থান আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে এ সম্ভাবনাময় জনশক্তি বোঝায় পরিণত হতে পারে। সর্বশেষ সরকারি শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ এবং বেকারত্বের হার ৩.৬৬ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য তরুণের, হতাশা এবং অপূর্ণ সম্ভাবনার গল্প। তাই শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এখন সময়ের দাবি।

রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন আজ আর বিলাসিতা নয়; এটি অপরিহার্য প্রয়োজন। সংস্কার বলতে কেবল প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতির পরিবর্তনও বোঝায়। নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুসংহত করা, প্রশাসনকে পেশাদার করা, স্থানীয় সরকারকে কার্যকর করা, দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া এবং সংসদীয় জবাবদিহি শক্তিশালী করাÑ এসব পদক্ষেপ একটি আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের ভিত্তি হতে পারে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও ইনসাফ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এমন শিক্ষা দরকার, যা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল নয়; বরং নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দেশপ্রেমে সমৃদ্ধ নাগরিক তৈরি করবে। একইভাবে স্বাস্থ্যসেবা যেন মানুষের আর্থিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল না হয়, বরং মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়Ñ সেদিকেও রাষ্ট্রকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আজকের বিশ্বে একটি দেশের মর্যাদা নির্ভর করে তার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা, আইনের শাসন, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা এবং সুশাসনের ওপর। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক সম্পর্কেও এসব বিষয় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা শুধু নৈতিক বা ধর্মীয় দায়িত্ব নয়; এটি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতারও পূর্বশর্ত।

সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্র গঠনের দায়িত্ব কেবল সরকারের নয়; নাগরিকদেরও। আইন মেনে চলা, কর প্রদান, দুর্নীতিকে সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা, ভিন্নমতকে সম্মান করা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখাÑ এসবও একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণের অপরিহার্য উপাদান। রাষ্ট্র ও নাগরিকÑ উভয়ের সম্মিলিত দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।

জুলাইয়ের চেতনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্রক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু ন্যায়বিচারের আদর্শ চিরস্থায়ী। ক্ষমতার পরিবর্তনই কোনো আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে না; প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি রাষ্ট্র নির্মাণ, যেখানে আইনের শাসন অটুট থাকবে, দুর্নীতির স্থান থাকবে না, প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং প্রত্যেক নাগরিক মর্যাদা ও অধিকারের নিশ্চয়তা পাবেন।

আজ বাংলাদেশের সামনে সুযোগও আছে, চ্যালেঞ্জও আছে। এই সময়ে প্রয়োজন দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি জাতীয় অঙ্গীকারÑ রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ নয়; সর্বাগ্রে থাকবে জনগণের অধিকার, ন্যায়বিচার, সুশাসন এবং জবাবদিহি। তাহলেই জুলাইয়ের চেতনা কেবল স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা রূপ নেবে একটি কার্যকর রাষ্ট্রদর্শনে। সেই রাষ্ট্রে উন্নয়ন হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, বিচার হবে নিরপেক্ষ, প্রশাসন হবে জনমুখী, অর্থনীতি হবে বৈষম্যহীন এবং নাগরিকের মর্যাদা হবে সর্বোচ্চ মূল্যবোধ।

জুলাইয়ের প্রকৃত শিক্ষা এখানেইÑ ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত না হলে উন্নয়ন টেকসই হয় না, সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্র কখনো জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে না। অতএব, জুলাইয়ের চেতনার সর্বোত্তম বাস্তবায়ন হবে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে ন্যায় হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি, সততা হবে নেতৃত্বের পরিচয়, আর জনগণের অধিকার হবে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ অঙ্গীকার।