সম্প্রতি বিএসএফ-বিজিবি শীর্ষ সীমান্ত বৈঠক শেষ হয়েছে। বৈঠকে নানা ইস্যুতে আলোচনার কথা বলা হলেও কোন বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে বলে সুস্পষ্টভাবে কিছু জানা যায়নি। এমনকি যৌথ সংবাদ সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়নি। এতে বৈঠকের সাফল্য নিয়ে রীতিমত ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখ্য, ভারতের নয়াদিলীøøতে বিএসএফ সদর দফতরে যখন দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা নিয়ে টেবিল বৈঠক চলছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তজুড়ে এক নজিরবিহীন ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে জোরপূর্বক পুশইনের মারাত্মক অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর বিপরীতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয় জনসাধারণ পুশইনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে গত ১১ জুন সীমান্ত সম্মেলন আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়। তবে আলোচনা তেমন ফলপ্রসূ হয়নি বলেই ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে পুশইন ও সীমান্ত হত্যার বিষয়সহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হলেও ভারতের উপর্যুপরি পুশইনের চেষ্টার কারণে সীমান্ত উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু উভয় দেশের সীমান্তরক্ষীদের শীর্ষ বৈঠকেও বরফ গলেনি বরং ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে সীমান্তে আমাদের বৃহত প্রতিবেশী ভারত অতীত বৃত্তেই বৃত্তাবদ্ধ থাকতে চায়। তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকেই স্বীকার করতে চায় না।

উল্লেখ্য, গত কয়েক দিনে উত্তর, উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তগুলোতে একাধিকবার বন্দুকযুদ্ধের মুখোমুখি অবস্থান ও তীব্র বাক-বিতণ্ডতার মুখোমুখি হয়েছে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষীরা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, পুশইনের বিরোধিতা করায় কোনো কোনো পয়েন্টে বিএসএফ জওয়ানরা বিজিবিকে লক্ষ্য করে গুলির ছোঁড়ার হুমকি দিয়েছে, যার বিপরীতে বিজিবিও রণপ্রস্তুতি নিয়ে কড়া ও পাল্টা জবাব দিয়েছে। ফলে ভারতীয় পক্ষের উগ্রতা ও সীমালঙ্ঘনের কারণে যেকোন মহুর্তে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

উল্লেখ, নয়াদিলীøতে ৮ জুন থেকে শুরু হওয়া চার দিনব্যাপী মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন গত ১১ জুন শেষ হয়েছে। সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী ১৫ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিএসএফের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাহিনীর মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এবার ‘অবৈধ পুশইন’ ও ‘সীমান্ত হত্যা’ বন্ধের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছে ভারতীয় পক্ষকে। যা প্রতিবেশী দেশের আঁতে ঘা লেগেছে বলেই মনে হচ্ছে। তাদের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, আমাদের বৃহত্ত প্রতিবেশী আমাদের স্বাধীন স্বত্ত্বাকেই স্বীকার করে না বরং বাংলাদেশকে তারা দেশটির অঙ্গরাজ্য মনে করতেই পুলকবোধ করে। যা বাংলাদেশে নিয্ক্তু নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মূলত, পশ্চিমবঙ্গে বিজিপি ক্ষমতা আসার পর বাংলাদেশের সাথে দেশটির সীমান্ত পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। যদিও পশ্চিম বাংলার বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে নানাবিধ বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সেসব দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়। তাই সে বিষয়ে নিয়ে অহেতুক আলোচনার সূত্রপাত করতে চাই না। তবে বিজিপি ক্ষমতায় আসার পর সার্বিক পরিস্থিতির যে মারাত্মক অবনতি হয়েছে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। তবে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তকে বরাবরই অস্থির করে রেখেছে। বিজিবি সদর দফতরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত গত এক বছরে অন্তত দু’হাজার ৪৬৩ জনকে কোনো প্রকার আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ছাড়াই জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করেছে ভারত। এর মধ্যে ভারতীয় নাগরিক ও রোহিঙ্গারাও রয়েছে। চলতি জুন মাসের প্রথম সপ্তাহেই পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, লালমনিরহাট ও জামালপুর সীমান্তে কয়েক হাজার মানুষকে পুশইনের এমন বহু চেষ্টা বিজিবির কড়া সতর্কতায় ব্যর্থ হয়েছে।

মাঠপর্যায়ের সীমান্ত থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, জামালপুরের বকশীগঞ্জের ধানুয়া কামালপুর এবং লালমনিরহাটের দুর্গাপুর সীমান্তে পুশইনের সময় দু’বাহিনীর মধ্যে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়। গত মঙ্গলবার ভোরের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে বিএসএফ সার্চলাইট নিভিয়ে এবং জিরো লাইনে কাঁটাতারের গেট খুলে নারী ও শিশুদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিতে চায়। এ সময় বিজিবি জওয়ানরা বুক চিতিয়ে বাধা দিলে বিএসএফের কোম্পানি কমান্ডার ও জওয়ানরা মারমুখী আচরণ করে এবং অস্ত্র উঁচিয়ে বিজিবিকে গুলী করার হুমকি দেয়। উপস্থিত বিজিবি সদস্যরা বিন্দুমাত্র পিছু না হটে তাৎক্ষণিকভাবে অস্ত্র তাক করে পাল্টা পজিশন নেন। বিজিবির পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়, ‘বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবৈধভাবে এক পা-ও কাউকে বাড়াতে দেয়া হবে না। যদি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে গুলী চালানো হয়, তবে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিজিবিও তার অস্ত্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে বাধ্য থাকবে।’ বিজিবির এমন আপসহীন; বীরত্বপূর্ণ ও অনমনীয় অবস্থানের মুখে বিএসএফ পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। একই সাথে স্থানীয় হাজার হাজার সীমান্তবাসী লাঠি নিয়ে বিজিবির পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলায় বিএসএফের পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে যায়।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফের এমন দায়িত্বহীন ও উসকানিমূলক আচরণের কারণে সীমান্ত পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে। পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্ত এবং ঠাকুরগাঁও সীমান্তের শূন্যরেখায় নারী ও শিশুসহ বেশ কিছু মানুষ কয়েক দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে, রোদ-বৃষ্টির মধ্যে আটকে আছেন। ভারতের পক্ষ থেকে তাদের জোর করে ঠেলে দেয়া হলেও নাগরিকত্ব ও আইনি প্রমাণ ছাড়া বিজিবি তাদের প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। এ সঙ্কট নিরসনে স্থানীয় পর্যায়ে একাধিকবার বিজিবি-বিএসএফের ফ্ল্যাগ মিটিং বা পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের একগুঁয়েমির কারণে কোনো সুরাহা হয়নি এবং বৈঠকগুলো ব্যর্থতায় পরিণত হয়েছে।

সীমান্তে চলমান উত্তেজনা এবং বিএসএফের মারমুখী আচরণ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, নয়াদিল্লীতে যখন দু’দেশের শীর্ষ পর্যায়ে সীমান্ত বৈঠক চলছে, ঠিক সে মুহূর্তে সীমান্তে বিএসএফের বেআইনি পুশ ইনের অপচেষ্টা ও গুলীর হুমকি অত্যন্ত অশোভন এবং এটি মূলত বাংলাদেশের ওপর একধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির নামান্তর। তারা মনে করেন, কোনো দেশের নাগরিককে যদি ফেরত পাঠাতেই হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ‘ডিউ প্রসেস’ বা যথাযথ কূটনৈতিক চ্যানেলে পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে হতে হবে। রাতের অন্ধকারে অস্ত্রের মুখে ঠেলে দেয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কিন্তু ভারত কোন আইন-কানুন বা বিধি-বিধানের ধার ধারছে না বরং পেশিশক্তির জোরেই নিরীহ বাংলাভাষী মুসলমানদের অযৌক্তিক ও অমানবিকভাবে বাংলাদেশী আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। ফলে বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএসএফের গুলীর হুমকির জবাবে বিজিবি যে অনমনীয় সাহস দেখিয়েছে, তা বাংলাদেশের সার্বভৌম চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীমান্তে একতরফা ছাড় দেয়ার যে নীতি ছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে বিজিবি এখন দেশের সীমানা রক্ষায় যথাযথ পেশাদারিত্ব দেখাচ্ছে। তবে এ সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি বাংলাদেশকে কূটনৈতিক ফ্রন্টেও অত্যন্ত শক্ত অবস্থান নিতে হবে। তবে একথা ঠিক যে, সরকারের কোন ভাবেই নতজানু হওয়ার সুযোগ নেই বরং সীমান্তে ভারত কর্তৃক সৃষ্ট জটিলতার দৃঢ়তার সাথে মোকাবেলা করার সাথে সাথে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। কারণ, ভারত কোন সৎ প্রতিবেশী নয়। শুধু বাংলাদেশ নয় বরং কোন প্রতিবেশীর সাথেই তাদের সুসম্পর্ক নেই। সবার সাথে দাদাগিরি করতে গিয়ে তারা এখন অনেকটাই ব্যাকফুটে।

সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পুশইন এবং সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশকে যৌক্তিক ও আইনানুগ অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। পতিত স্বৈরাচারি ও ফ্যাসিবাদী আমলের মত দাসপ্রবণ মনোভাব পোষণের কোন সুযোগ নেই। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার রয়েছে যে, আমরা ভারত বিরোধী। কিন্তু একথা তাদেরকে বুঝিয়ে দিতে হবে আমরা ভারতবিরোধী নই বরং ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও অন্যায় আচরণের বিরোধী। তারা মনে করেন, দিল্লীর বৈঠক সহ সকল দ্বিপাক্ষিক সীমান্ত বাংলাদেশ পক্ষকে অত্যন্ত জোরালোভাবে এ বার্তা দিতে হবে যে, বন্ধুত্বের নামে সার্বভৌমত্বের অবমাননা এবং নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর নির্যাতন কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না। হয়তো সদ্য সমাপ্ত শীর্ষ সম্মেলনে আমাদের বিজিবি প্রধান সে কাজটাই সফল ও স্বার্থকভাবেই করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, সে কারণে সীমান্ত সম্মেলন অমিমাংসিতভাবেই শেষ হয়েছে। অবশ্য বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, শীর্ষ সম্মেলনের কার্যবিবরণী চূড়ান্তকরণ ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বিজিবির পক্ষ থেকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় পুশইনের বিষয়টি অবৈধ ও আন্তর্জাতিক আইন পরিপন্থী বলে উত্থাপন করা হয়েছে। রাতের অন্ধকারে লাইট বন্ধ করে পুশইন করার চেষ্টার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ভারতের কাছে হস্তান্তর করেছে বাংলাদেশ। যা আমাদের জাতীয় মর্যাকেই উচ্চকিত করেছে।

ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবরই অস্থির ও অশান্ত করে রেখেছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই বিএসএফের গুলিতে ও নির্যাতনে অন্তত আটজন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন। এ বিষয়ে দিলীøর সম্মেলনে শূন্যের কোঠায় নামানোর জন্য ভারতের পূর্ব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের তাগিদ দেয়া হয়েছে। তবে বিএসএফের পক্ষে বরাবরের মতোই দাবি করছে যে, তারা কেবল ‘অবৈধ প্রবেশকারীদের’ ফেরত পাঠাচ্ছে। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল ভারতের এ দাবিকে নাকচ করে দিয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আইনি প্রক্রিয়াবিহীন যেকোনো পুশইন প্রচেষ্টা বাংলাদেশ সীমান্তে কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। তাই সদ্য সমাপ্ত সীমান্ত শীর্ষ সম্মেলনে ইতিবাচক কোন ফল পাওয়া যায় নি বলেই মনে করা হচ্ছে। ফলে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশ সীমান্তে বো-আইনি তৎপরতা সহ পুশইনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিজিবিও এসব অপতৎপরতার যোগ্য জবাব দিয়ে যাচ্ছে।

অনেক প্রত্যাশা নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত শীর্ষ সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও ভারতীয় পক্ষের অহমিকা ও আধিপত্যবাদী মনোভাবের কারণেই তা কোন প্রকার ইতিবাচক ফলাফল ছাড়াই শেষ হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল হতাশা ব্যক্ত করে বলছেন, শীর্ষ সম্মেলনে পর্বত মুশিকও প্রসব করেনি। ফলে সীমান্ত পরিস্থিতি ক্রমেই অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠছে। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম পিটিআইয়ের খবরে বলা হয়েছে, শীর্ষ সম্মেলনে সীমান্তের সাম্প্রতিক উত্তেজনাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে শীর্ষবৈঠক শেষে কোনো যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন হয়নি। এতেই প্রমাণ হয় শীর্ষ সম্মেলন কোন প্রকার ইতিবাচক ফলাফল ছাড়াই শেষ হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ৮ জুনবাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’ (বিজিবি)’র প্রধান মেজর জেনারেল মহম্মদ আশরাফুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল নয়াদিলীøতে পৌঁছে বিএসএফের ডিজি প্রবীণ কুমার-সহ অন্যান্য কর্তাদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা করেন। মঙ্গলবার দিল্লির লোদী রোডে বিএসএফের সদর দফতরে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল ভারত-বাংলাদেশ ৫৭তম সীমান্ত শীর্ষবৈঠক। কিন্তু নজিরবিহীন ভাবে শীর্ষবৈঠক শেষে যৌথ আলোচনার নথিতে স্বাক্ষরের পর দু’বাহিনীর ডিজি প্রথা মেনে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন করেননি। শুধু কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে সে সম্পর্কে একটি প্রেস বিবৃতি দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের ইতিহাসে এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল।

চলতি বছরের গোড়ার দিকে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ঢাকায় বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবং পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর এটিই ছিল প্রথম বৈঠক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি ঢাকায় সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে বিএসএফের ‘পুশইন’ এবং সীমান্তে গুল চালানোর ঘটনাগুলো তারা বৈঠকে উত্থাপন করবেন। প্রসঙ্গত, দু’দেশের মধ্যে ডিজি-স্তরের সীমান্ত বৈঠক ১৯৭৫ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হতো। তবে ১৯৯৩ সালে এটিকে বছরে দু’বার আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যেখানে উভয়পক্ষ পর্যায়ক্রমে নয়াদিলীø ও ঢাকায় বৈঠকে অংশ নেয়। বিএসএফ-বিজিবি সর্বশেষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৫ সালের আগস্টে ঢাকায়। তখন বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় ছিল।

ভারত-বাংলাদেশের মোট ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্তের অর্ধেকেরও বেশি (২,২১৬ কিলোমিটার) পশ্চিমবঙ্গের সাথে। সীমান্তের প্রায় ৮৬০ কিলোমিটার অংশ কাঁটাতারের বেড়াবিহীন রয়েছে, যার মধ্যে ১৭৪.৫১ কিলোমিটার এমন এলাকা রয়েছে যেখানে বেড়া নির্মাণ সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে তারা অবৈধ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের (তাদের ভাষায়) বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে এবং অনুপ্রবেশকারী ব্যক্তিদের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট বা শনাক্ত, তালিকা থেকে বাদ এবং বহিষ্কারের পর্যায়ক্রমিক থ্রিডি অ্যাকশনের মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে, পশ্চিম মুখমন্ত্রীর দাবি ও সাম্প্রতিক কর্মতৎরতা রাজনৈতিক দুরভিসন্ধিমূলক। তার দাবির তেমন কোন সত্যতা নেই। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্যই তিনি নানাবিধ বায়বীয় অভিযোগ উত্থাপন করছেন। ফলে বিপন্ন হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ।

মূলত, ভারত সরকার পরিকল্পিতভাবেই বাংলাদেশ সীমান্তকে অস্থির ও আশান্ত করে তুলছে। তাদের অভিযোগের তেমন কোন সত্যতা নেই। কোন বাংলাদেশী সেদেশে অনুপ্রবেশ করে থাকলে সে সমস্যার সমাধানের জন্যই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইন রয়েছে। কিন্তু ভারত বা পশ্চিমবঙ্গ সরকার সে আইনানুগ পথে না গিয়ে সীমান্তে অনাকাক্সিক্ষভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে।

তাই বাংলাদেশকে সীমান্ত পরিস্থিতি মোকাবেলায় কোন প্রকার শৈথিল্য প্রদর্শনের সুযোগ নেই বরং আইন ও বিধি মেনে; একই নিজেদের স্বার্বভৌমত্ব ও আত্মসম্মান বাজায় রেখেই করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। কারো চোখ রাঙানীতে ভয় পাওয়ার কোন সুযোগ নেই।

www.syedmasud.com