চীনে উচ্চশিক্ষার জন্য আসার পর আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়েছে ফুজিয়ান প্রদেশের শিয়ামেন শহরে অবস্থিত শিয়ামেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। গত দুই বছর ধরে এই শহরে বসবাস করে আমি শুধু একটি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হইনি, বরং চীনের সংস্কৃতি, উন্নয়ন, জীবনযাত্রা এবং সামাজিক ব্যবস্থাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে এই অভিজ্ঞতা আমার ব্যক্তিগত ও একাডেমিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
শিয়ামেন শহরকে অনেকেই “Garden on the Sea” নামে অভিহিত করেন। শহরটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সমুদ্রতীর, সবুজায়ন এবং পরিকল্পিত নগরায়ন সত্যিই অনন্য। একজন বাংলাদেশি হিসেবে শিয়ামেনের আবহাওয়া এবং প্রকৃতি আমাকে অনেক সময় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কথা মনে করিয়ে দেয়। এখানকার জলবায়ু তুলনামূলকভাবে উষ্ণ ও আর্দ্র, যা আমাদের দেশের সঙ্গে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। সমুদ্রঘেরা এই শহরের শান্ত পরিবেশ ও মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সুন্দর ও আরামদায়ক জীবনযাপনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
শিয়ামেনের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব নগর ব্যবস্থা। রাস্তার দুপাশে গাছপালা, সমুদ্রঘেঁষা সড়ক, পার্ক এবং সবুজায়ন শহরটিকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে। নগর উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে যে ভারসাম্য চীন বজায় রেখেছে, শিয়ামেন তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এখানকার গণপরিবহন ব্যবস্থা অত্যন্ত আধুনিক ও সময়নিষ্ঠ। বাস, মেট্রো এবং অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থা সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী। ডিজিটাল পেমেন্ট, স্মার্ট সিটি ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবাগুলো দৈনন্দিন জীবনকে অনেক সহজ করেছে। একই সঙ্গে জননিরাপত্তা অত্যন্ত উন্নত, যা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে।
আমি বর্তমানে শিয়ামেন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা ও গবেষণার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ের। আধুনিক গবেষণাগার, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, উন্নত গবেষণা সুবিধা এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকবৃন্দ শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা ও গবেষণাকে উৎসাহিত করেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সহায়ক ও বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ এখানে বিদ্যমান। চীনের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো গবেষণাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। শিক্ষার্থীদের শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বরং বাস্তবমুখী গবেষণা, উদ্ভাবন এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জনে উৎসাহিত করা হয়। এই অভিজ্ঞতা আমার ব্যক্তিগত ও পেশাগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
চীনা সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রাও আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এখানকার মানুষ পরিশ্রমী, নিয়মানুবর্তী এবং সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঐতিহ্যবাহী উৎসব এবং স্থানীয় জীবনধারা চীনের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় ভবিষ্যতে আরও জোরদার হতে পারে। চীনের পরিকল্পিত নগরায়ন, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় হতে পারে।
তদুপরি চীনের শিয়ামেনে অবস্থানকালে আমি গুয়াংজু, সাংহাই, বেইজিং, দালিয়ান, ইয়ানতাই শহর ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছি। এসব শহরের উন্নত অবকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে।
পরিশেষে, শিয়ামেনে আমার দুই বছরের অভিজ্ঞতা আমাকে শুধু একজন শিক্ষার্থী হিসেবে নয়, বরং একজন বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবেও সমৃদ্ধ করেছে। সমুদ্র, প্রকৃতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতির অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই শহর ও এর শিক্ষা ব্যবস্থা আমার জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।
মোঃ মনজুরুল হাসান
শিক্ষার্থী, শিয়ামেন ইউনিভার্সিটি, চায়না