মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতির অবস্থান বহাল রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে নীতি সুদহার (পলিসি রেপো রেট) ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণের স্থবিরতা কাটিয়ে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি আনতে শিল্প, কৃষি এবং কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসময় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানসহ ডেপুটি গভর্নর ও শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান।

মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ ১৯৭২ (২০০৩ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি কম এবং স্থিতিশীল রাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য। মূল্যস্থিতি বজায় রাখার মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রকৃত বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ করাই এই নীতির উদ্দেশ্য। আরও বলা হয়েছে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় অর্থনীতি নানা চাপের মধ্যে ছিল। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থাহীনতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নি¤œ ও প্রান্তিক আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছিল। সরকার মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি রফতানিমুখী ও বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধির কৌশল অনুসরণ করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৭ শতাংশে উঠেছিল। কঠোর মুদ্রানীতির কারণে তা কমে চলতি বছরের মে মাসে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে মূল্যস্ফীতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না আসায় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির অবস্থান বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতি এখনো নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জ্বালানি ও সারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এসব কারণে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলেও শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কারণ বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় অংশই অতিরিক্ত চাহিদার কারণে নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজারের অদক্ষতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। এর পাশাপাশি উচ্চ সুদহার, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং সরকারের ঋণ গ্রহণ বাড়ার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৬ সালের মে মাস শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৫ শতাংশে। ফলে ব্যাংকগুলো উদ্বৃত্ত তারল্য উৎপাদনমুখী খাতে ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে কম ঝুঁকির সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি স্থায়ী ঋণ সুবিধার সুদহার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং স্থায়ী আমানত সুবিধার সুদহার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বহাল থাকবে।

অর্থনৈতিক কর্মকা-ে গতি আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই তহবিল শিল্প, কৃষি এবং কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতে বিতরণ করা হবে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং শিল্প উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত হবে।

মুদ্রানীতিতে আরও বলা হয়েছে, বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাজারভিত্তিক ও নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। এর মাধ্যমে রফতানি প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং প্রবাসী আয় আরও উৎসাহিত হবে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোর নিরীক্ষা, নতুন ঋণ নিষ্পত্তি কাঠামো বাস্তবায়ন, প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি পদ্ধতি চালু, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার এবং সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন চূড়ান্ত করার উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থঋণ আদালত আইনে সংশোধন এনে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ডিজিটাল লেনদেনে স্বচ্ছতা ও আন্তঃব্যাংক লেনদেন সহজ করতে ‘বাংলা কিউআর’ নামে অভিন্ন ডিজিটাল পরিশোধ ব্যবস্থা চালুর বিষয়টিও মুদ্রানীতিতে গুরুত্ব পেয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নির্বিঘœ ডিজিটাল লেনদেন সম্ভব হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, নতুন অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক ও কর যৌক্তিকীকরণ এবং লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তার ফলে ধীরে ধীরে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকা-ে গতি ফিরবে। তবে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা আগামী দিনেও দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।