ফ্রান্স থেকে মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম: আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সংলাপের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ফ্রান্সের ঐতিহাসিক প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদ। বৃহস্পতিবার ( ১৮ জুন) বেলা ১১টায় “কঁফেরঁস দেজ এভেক দ্য ফ্রঁস”বা ফ্রান্সের বিশপ সম্মেলন-এর জাতীয় পরিষেবা সমূহের প্রায় ১০০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল মসজিদটি সফর করে।
প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন ফরাসি বিশপ সম্মেলনের মহাসচিব ও মুখপাত্র ক্রিস্টোফ ল্য সু এবং মুসলিমদের সঙ্গে সম্পর্কবিষয়ক জাতীয় প্রতিনিধি জ্যঁ-ফ্রাঁসোয়া বুর। সফরে আরও অংশ নেন আন্তঃধর্মীয় সংলাপ, ধর্মীয় সম্পর্ক এবং সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।
সফরের শুরুতে অতিথিদের মসজিদের হলরুমে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদের রেক্টর শেমস-এদ্দিন হাফিজ। পরে প্রতিনিধিদল মসজিদের বিভিন্ন অংশ পরিদর্শন করেন এবং প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, ইসলামী সভ্যতার ঐতিহ্য ও ফ্রান্সে মুসলিম সম্প্রদায়ের অবদান সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত হন।
আলোচনায় মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। প্রায় এক শতাব্দী ধরে প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বোঝাপড়া, সংলাপ ও সহযোগিতার সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে রেক্টর শেমস-এদ্দিন হাফিজ বলেন,”আপনাদের উপস্থিতি আমাদের জন্য আশার প্রতীক। এমন এক সময়ে আমরা একত্রিত হয়েছি, যখন বিশ্ব নানা সংকট, সংঘাত ও বিভাজনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের সাক্ষাৎ ও সংলাপ ভবিষ্যতের জন্য আমাদের আশাবাদী করে তোলে।”
তিনি আরও বলেন, “প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদে আপনারা নিজেদের ঘরের মানুষ হিসেবেই অনুভব করবেন। আমাদের প্রত্যাশা, আজকের এই সাক্ষাৎ শেষে আমরা সবাই আরও দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে ফিরে যাব; শান্তি, সংলাপ ও মানবিক ভ্রাতৃত্বের দূত হিসেবে কাজ করার জন্য।”
রেক্টর হাফিজ তাঁর বক্তব্যে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে পোপ লিও চতুর্দশ-এর সম্ভাব্য প্যারিস সফরের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আমরা এই সফরকে ফ্রান্স এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করা সকল মানুষের জন্য এক ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখি। ভবিষ্যতে তাঁকেও প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদে স্বাগত জানানোর সুযোগ হবে বলে আমরা আশা করি।”
সফর শেষে খ্রিস্টান প্রতিনিধিদের সম্মানে মসজিদ প্রাঙ্গণে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়। সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা পারস্পরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ইউরোপজুড়ে ধর্মীয় বিভাজন, উগ্রবাদ ও সামাজিক মেরুকরণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের আন্তঃধর্মীয় সফর ও সংলাপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মুসলিম ও খ্রিস্টান নেতাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও সহযোগিতা সামাজিক সম্প্রীতি, সহনশীলতা এবং জাতীয় ঐক্যকে আরও সুদৃঢ় করতে সহায়তা করে।
এই সফরের মাধ্যমে ফ্রান্সের দুই বৃহৎ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা আবারও প্রমাণ করলেন যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, খোলামেলা আলোচনা এবং সহযোগিতার মাধ্যমেই একটি শান্তিপূর্ণ, সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।