আশরাফুল আলম সিদ্দিকী কাজল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সংবাদদাতা

চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা গৌড়ের সোনামসজিদ। ৫শ’ বছরের ইতিহাসের সাক্ষি এ মসজিদটি। মুসলিম শাসনামলে বাংলার রাজধানী গৌড় নগরীর উপকণ্ঠে পিরোজপুর এলাকায় মসজিদটি তৈরি করা হয়। ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি নির্মাণশৈলীর কারণে প্রতিবছর দেশ-বিদেশের হাজার হাজার দর্শনার্থী মসজিদটি দেখতে আসেন। ১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ’র শাসনামলে ওয়ালী মুহাম্মদ নামে ব্যক্তি মসজিদটি নির্মাণ করেন। ১৫টি গম্বুজের একসময়ে সোনালী আস্তরণের কারণে এটি ছোট সোনামসজিদ নামে পরিচিত। যা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহর থেকে ৩৮ কিলোমিটার দূরে শিবগঞ্জ উপজেলায় মসজিদটির অবস্থান। মসজিদটির সামনে রয়েছে বেশ কয়েকটি কবর। উঁচু মঞ্চের ওপর অবস্থিত বড় কবর দুটি কার তা জানা যায়নি। ধারণা, এর একটি ওয়ালী মোহম্মদের এবং অন্যটি তার স্ত্রীর। মতান্তরে এই দুটি কাল্পনিক কবর। বরং এতে মসজিদ প্রতিষ্ঠাতার গুপ্তধন রক্ষিত রয়েছে। এছাড়া অন্য কবরগুলো তৎকালীন মুসলিম যোদ্ধাদের। প্রাচীন গৌড়ে আরেকটি মসজিদ রয়েছে, যা বড় সোনামসজিদ নামে পরিচিত। এটি তৈরি করেছিলেন সুলতান নুসরত শাহ। বর্তমানে এটি ভারতের মালদহ জেলার মোহদিপুরে রয়েছে। ছোট সোনামসজিদে ১১টি দরজা বা প্রবেশপথ রয়েছে। উত্তর দিকের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় একটি কক্ষ রয়েছে। মসজিদের চারকোণে ৪টি বুরুজ রয়েছে। এগুলোর ভূমি নকশা অষ্টকোণাকার। মসজিদের পূর্ব দেয়ালে ৫টি খিলানযুক্ত দরজা রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে রয়েছে তিনটি করে দরজা। তবে উত্তর দেয়ালের পশ্চিমের দরজাটির জায়গায় রয়েছে সিঁড়ি। এই সিঁড়িটি উঠে গেছে মসজিদের অভ্যন্তরে উত্তরপশ্চিম দিকে দোতলায় অবস্থিত একটি বিশেষ কামরায়। কামরাটি পাথরের স্তম্ভের ওপর অবস্থিত। এটি ছিল সুলতান বা শাসনকর্তার নিরাপদে নামায আদায়ের জন্য আলাদাভাবে তৈরি একটি কক্ষ। মসজিদের ছাদে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন ১৫টি গুম্বুজ। এই মসজিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বাইরের যে কোনো দিক থেকে দেখলে কেবল ৫টি গম্বুজ দেখা যায়, পেছনের গম্বুজগুলো দৃষ্টিগোচর হয় না। মসজিদের বাইরের দিকে সোনালি রংয়ের আস্তরণ ছিল, সূর্যের আলো পড়লে এই রং সোনার মতো ঝলমল করত। তবে জনশ্রুতি রয়েছে গম্বুজগুলো সোনার পাতে মোড়ানো ছিল বলে এর নামকরণ করা হয় সোনামসজিদ। মসজিদের দেয়ালের গায়ে কালো পাথরের ওপর খচিত রয়েছে বিভিন্ন গাছপালা ও ফুলের কারুকার্যময় নকশা। মসজিদের ভেতরে মেহরাবের ওপর ছিল শ্বেত পাথরের দুটি উজ্জ্বল শিলাখ-। সূর্যালোকে শ্বেতপাথর দু’টি উজ্জ্বল বর্ণ ধারণ করায় আলোকিত হয়ে উঠত পুরো মসজিদ ঘর। ১৮৯৭ সালের এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে মসজিদটির একাংশ ও মেহরাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে তা ইট দিয়ে মেরামত করা হয়। এ সময় মধ্যবর্তী মেহরাবের ওপর স্বতন্ত্র দু’টি শ্বেত পাথরের উজ্জ্বল শিলাখ- ও আরও কয়েক টুকরো মূল্যবান পাথরখ- ইংরেজরা নিয়ে যায়। এমনকি পশ্চিম দেয়ালের কারুকার্যপূর্ণ দুষ্প্রাপ্য ও বহু মূল্যবান শিল্প নিদর্শনও স্থানান্তরিত হয়ে বিলেতে চলে যায়। প্রতœতত্ত্ব বিভাগের দায়িত্বে থাকা ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি সুপরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি পর্যটন এলাকা হিসেবে ঘোষণার দাবি এখানে আসা দর্শনার্থীদের। ঐতিহাসিক এই মসজিদ প্রাঙ্গণে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের কবর। এর পাশের কবরটি তৎকালীন সেক্টর কমান্ডারস মেজর নাজমুল হকের। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তারা শহীদ হন। ঐতিহাসিক জেনারেল ক্যানিংহামের মতে, কিছুসংখ্যক স্বর্ণশিল্পী এই মসজিদের সাজসজ্জার নকশা প্রস্তুত করেছিলেন। ভারতের বেনারস থেকে আগত শিল্পীদের মাধ্যমে এই মসজিদের কারুকার্য সম্পাদিত হয়েছিল। মূল মসজিদের উত্তর দিকে একটি দীঘি রয়েছে। জনশ্রুতি রয়েছে, ‘এক প্রহর বেলা পর্যন্ত সোনা বর্ষিত হয়েছিল, মতান্তরে প্রচুর সোনা পাওয়া গেছে সেজন্য স্বর্ণপ্রাপ্ত ব্যক্তি কর্তৃক এখানে দীঘি খনন ও মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়ে সোনামসজিদ’ নামকরণ করা হয়েছে। এই দীঘিতে তামার বড় বড় হাঁড়িতে গুপ্তধন পাওয়া গিয়েছিল বলেও জনশ্রুতি রয়েছে।