মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, রংপুর অফিস ও সফিকুল ইসলাম, পীরগঞ্জ সংবাদদাতা : রংপুরের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে প্রথম শহীদ পুলিশের গুলীতে নিহত সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলার অভিযুক্ত আসামীদের শাস্তি কার্যকর দেখতে চান বাবা মোহাম্মদ মকবুল হোসেন। একই সাথে অভিযুক্তদের দ্রুত শাস্তি কার্যকর করার দাবি জানান তিনি। সেই সাথে কোটা বৈষম্যের শিকার হয়ে আর যেন কোন তরুন প্রাণ ঝরে না যায় সেই প্রত্যাশা করেন এই শহীদের বর্ষীয়ান পিতা।
তিনি গত মঙ্গলবার অপরাহ্নে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার মদনখালী ইউনিয়নের নিভৃত পল্লী জাফরপাড়া বাবনপুর গ্রামের নিজ বাসভবনে দৈনিক সংগ্রামের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। বর্তমানে নানা শারীরিক অসুস্থতায় কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছেন তিনি। কোটা আন্দোলনের শহীদ এবং আহত যোদ্ধাদের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলাসমূহের তেমন কোন সফল অগ্রগতি না থাকায় হতাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এসব বিচারের কোন অগ্রগতি হয়নি। তিনি বলেন, সঠিকভাবে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কোন অপরাধী যেন আইনের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে যেতে না পারে। আবার কোন নিরাপরাধ ব্যক্তি যেন অযথা হয়রানির শিকার না হয় সে ব্যাপারে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এই শহীদের পিতাকে রাষ্ট্র এবং সমাজ যে ভাবে সম্মান প্রর্দশন করেছে, এতে তিনি অত্যন্ত সন্তষ্ট। দেশ যেন আরও সুন্দর ভাবে পরিচালিত হয় এই কামনা করে তিনি বলেন, কোটা সংস্কার হয়নি একথা যেন আর শুনতে না হয়। সবাই যেন সম্মানজনকভাবে জীবন গড়ার অধিকার ফিরে পায় সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য তিনি সবার জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করেন।
উল্লেখ্য, কোটা সংস্কার আন্দোলনে বিগত ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন পার্কের মোড়ে পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের যৌথ হামলায় শিক্ষার্থীদের সংর্ঘষের একপর্যায়ে পুলিশের নির্বিচার গুলীতে নিহত হন আবু সাঈদ। পরদিন ১৭ জুলাই তাকে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার মদনখালী ইউনিয়নের জাফরপাড়া বাবনপুর গ্রামে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।
বৈষম্যবিরোধী কোটা সংস্কার আন্দোলনে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক ছিলেন আবু সাঈদ। এ ঘটনায় ১৭ জুলাই তাজহাট মেট্রোপলিটন থানায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে। ঐ মামলার বাদী হয়েছেন তাজহাট মেট্রোপলিটন থানার উপ-পরিদর্শক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায়। মামলার সংক্ষিপ্ত এজাহারে উল্লেখ করা হয়, দুপুর ২টা ১৫ মিনিটের দিকে ছাত্র নামধারী সুবিধাভোগী রাষ্ট্রবিরোধী আন্দোলনরত দুর্বৃত্তরা বিভিন্ন দিক থেকে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ও আগ্নেয়াস্ত্র হতে এলোপাতাড়ি গুলী শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যে পুলিশও এপিসি গাড়ির মধ্য হতে কনেষ্টবল/১১৮৬ সোহেল তার নামীয় সরকারি ইস্যু কৃত শটগান হতে ১৬৯ রাউন্ড রাবার বুলেট ফায়ার করে। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
আবু সাঈদের হত্যার বিষয়ে দায়ের করা মামলায় বলা হয়, বিভিন্ন দিক থেকে আন্দোলন কারীদের ছোড়া গোলাগুলী ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের এক পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। সহপাঠীরা ধরাধরি করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ২ থেকে ৩ হাজার ব্যক্তিকে আসামী করা হয়।
পরবর্তী পর্যয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের নির্দেশে ঐ বছর ১২ আগস্ট মামলাটি পিবিআইয়ে স্থানান্তর করা হয়। রংপুর জেলা পিবিআইয়ের তৎকালীন পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বিষয়টি সাংবাদিকদের নিকট নিশ্চিত করেছিলেন। পিবিআইয়ের তদন্তে আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই হত্যা মামলায় দুই পুলিশের ফাঁসি এবং তৎকালীন বেরোবি ভিসি ডক্টর হাসিবুর রশিদের ১০ বছরের কারাদন্ডসহ অন্যান্য আসামীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদন্ড দেয়া হয়।
এদিকে রংপুরের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে প্রথম শহীদ পুলিশের গুলিতে নিহত দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহীদ আবু সাঈদের দ্বিতীয় শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে মাসব্যাপী কর্মসূচীর অংশ হিসেবে বিভাগীয় নগরী রংপুরে জেলা প্রশাসন এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৬ই জুলাই বৃহস্পতিবার শীহদ দিবস ও ৫ই আগষ্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালন করা হবে। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ্য থেকে ঐদিন সকালে শীহদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত, শোক র্যালি, লাল ব্যাজ ধারন, স্মৃতি স্তম্ভে পুষ্পঅর্পণ, আলোচনা ও স্বরনসভা, কেন্দ্রীয় মসজিদে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। বেরোবির পক্ষ্য থকে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। শহীদ আবু সাঈদের পিতা মোহাম্মদ মকবুল হোসেন এবং শহীদ পরিবারের সদস্যবৃন্দ এসব অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি থাকবেন। এছাড়া এসব অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সচিব আশরাফুল ইসলাম, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডক্টর আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আব্দুল হাই শিকদার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ডক্টর মোহাম্মদ শওকাত আলী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন।
এছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ্য থেকে বিভিন্ন মসজিদে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে গত সোমবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক প্রস্ততি সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক মোহাম্ম রুহুল আমীন এতে সভাপতিত্ব করেন।