সদ্য পদত্যাগ করা সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে গ্রেফতারে আইনগত কোন বাধা নেই। সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে দেয়া দায়মুক্তি শুধুমাত্র দায়িত্বপালনকালীন সময়ের জন্য। এখন তিনি দায়িত্বে নেই। তিনি সাধারণ একজন নাগরিক। সরকার ইচ্ছা করলেই তাকে গ্রেফতার করতে পারে। তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে ও পরে যদি কোন অপরাধ করে থাকেন তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যাবে।
গতকাল সোমবার সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞগণ দৈনিক সংগ্রামকে এসব অভিমত ব্যক্ত করেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও আব্দুল হামিদের বিরুদ্ধে রোববার আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পৃথক দু’টি অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে দু’টি সংগঠনের পক্ষ থেকে। অপর দিকে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেলেঙ্কারীর ঘটনায় সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলা চলমান রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন উক্ত মামলার তদন্ত কার্যক্রম চালাচ্ছে।
মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করার পর থেকেই তাকে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইনকিলাব মঞ্চসহ কয়েকটি দল ও সংগঠন তার বিচারের দাবি তুলেছে। তবে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়ে সব অভিযোগ ও আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন সাহাবুদ্দিন।
পদত্যাগের পর সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিন বলেন, 'কীসের বিচার করবে? কীসের? কীসের বিচার করবে? সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ পড়ে দেখুক।'
সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে দুই ধরনের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ৫১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বা অনুরূপ বিবেচনায় কোনো কাজ করলে বা কোনো কাজের ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় থাকলে, সেটির জন্য কোনো আদালতে তার জবাবদিহিতা থাকবে না। তবে এই সুরক্ষা সরকারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫১(১) অনুচ্ছেদের সাংবিধানিক সুরক্ষা কেবল রাষ্ট্রপতির পদে থাকাকালীন নয়, বরং দায়িত্ব পালনকালীন করা কাজের জন্য পদ ছাড়ার পরেও বলবৎ থাকে। সংবিধানের ৫১(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালীন আলাদা সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে আসীন রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যধারা দায়ের করা বা চালু রাখা যাবে না। একইসঙ্গে তার গ্রেপ্তার বা কারাবাসের জন্য কোনো পরোয়ানা জারি করা নিষিদ্ধ। যেহেতু সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন, তাই এই সুরক্ষা তার ক্ষেত্রে আর প্রযোজ্য নয়।
আইনজ্ঞরা আরও বলছেন, ৫১ অনুচ্ছেদ সব কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে পূর্ণ দায়মুক্তি দেয় না। দাপ্তরিক দায়িত্বের বাইরের কাজ, দুর্নীতি, ফৌজদারি অপরাধ বা রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কোনো অপরাধ এই সুরক্ষার আওতায় পড়ে না। ফলে দাপ্তরিক সীমার বাইরের কাজের জন্য সাবেক রাষ্ট্রপতিকেও আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা সম্ভব।
এ বিষয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট মনজিল মোরশেদ দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, সাহাবুদ্দিন সাহেব এখন একজন সাধারণ নাগরিক। তাকে গ্রেফতার করতে আইনে কোন বাধা নেই। এখন গ্রেফতারটা কে করবে? সরকার করবে। সরকারের স্বরাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে মনে হয়েছে সরকার তাকে গ্রেফতার করবে না।
সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের ইনমেনিটি সর্ম্পকে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালীন সময়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে যেসব কাজ করেছেন সেগুলোর জন্য ৫১ অনুচ্ছেদে দায় মুক্তি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এর বাইরে অন্যান্য কাজের জন্য কোন দায় মুক্তি দেয়া হয় নাই। তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে বা পরে কোন অপরাধ করলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা যায় এবং গ্রেফতার করা যায়। এখন তিনি একজন সাধারণ নাগরিক। অন্যান্য নাগরিকের মতোই তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যায়।
ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, অভিযোগ যে কেউ করতে পারে। আওয়ামী লীগ আমলেও কিছু লোক বিভিন্ন মামলার অভিযোগ দায়ের করেছে। তবে সরকার কি করে সেটি হলো দেখার বিষয়। সরকারের ইচ্ছের উপর তার গ্রেফতার নির্ভর করছে। তবে সরকারের স্বরাষ্ট্র ও আইমন্ত্রীর বক্তব্যে মনে হচ্ছে তাকে গ্রেফতার করা হবে না।
সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ
চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়ে শেখ হাসিনার সাথে ফোনালাপের অভিযোগের প্রেক্ষিতে মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন বলে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে মো: সাহাবুদ্দিন বলেন, 'বিশ্ব এখন এতটাই সংযুক্ত যে যে কেউ যেকোনো জায়গা থেকে যোগাযোগ করতে পারে। বাংলাদেশ থেকে কি দিল্লির সঙ্গে কথা বলা যায় না? আমার লন্ডনে যাওয়ার প্রয়োজন কী?' তার দাবি, এসব অভিযোগের সঙ্গে পদত্যাগের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি জানান, শারীরিক সমস্যার কারণে সাত-আট দিন ধরেই তিনি পদত্যাগের কথা ভাবছিলেন।
পরবর্তী পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'এখন লক্ষ্য হলো দেশে অথবা বিদেশে ভালো চিকিৎসা নেওয়া।' শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে ১০-১২ দিনের মধ্যে তিনি বিদেশে যেতে পারেন বলেও জানান।
শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেনÑএমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বিষয়টি পত্রিকায় দেখেছেন। তবে সরকারের কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। ইন্টারনেটের এই যুগে কথা বলতে চাইলে লন্ডনে যেতে হয় না, এখান থেকেই বলা যায় বলে জানান তিনি।
বিরোধী দল মো. সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছেন। এ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধীপক্ষকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন তারা রাষ্ট্রপতির গ্রেপ্তার চায়। এখন রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে যাঁরা গালি দিচ্ছেন, সেই অধিকার তাঁদের আছে।’ গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিকভাবে মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা থাকবে বলে প্রত্যাশার কথা জানান মন্ত্রী। প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ
আওয়ামী লীগ আমলের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ‘আয়নাঘর’ এবং জুলাই-অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকান্ডের ঘটনায় নীরবতা পালন ও ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায়’ (সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি) থেকে সাবেক দুই রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও মো. সাহাবুদ্দিনের বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রোববার অভিযোগ দাখিল করেছে ‘বাংলাদেশ আজাদ পার্টি’ ও ‘রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম (এসডিএফ)’ নামের দুটি সংগঠন। তাদেরকে গ্রেফতারেরও আবেদন জানিয়েছে সংগঠন দু’টি।
ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের শেষে বাংলাদেশ আজাদ পার্টির পক্ষে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, হামিদ সাহেব, আরেকজন হচ্ছে চুপ্পু (সাহাবুদ্দিন) সাহেবÑ উনারা রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় দেশের মধ্যে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়, তার কোনো ভূমিকা রাখেননি। জনগণের কষ্টের টাকা, ট্যাক্সের টাকায় তাদের বেতন হতো, তা তারা উপভোগ করতেন। কিন্তু তারা কোনো দায়িত্ব পালন করেননি।
ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেলেঙ্কারির অভিযোগ
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর পক্ষে ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মো. আবদুচ ছামাদ বাদী হয়ে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে একটি দুর্নীতি ও প্রতারণার মামলা দায়ের করেন।
মামলায় দুর্নীতি, প্রতারণা ও অবৈধ বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ লুণ্ঠন ও আত্মসাতের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে পারস্পরিক যোগসাজশে 'ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেড'-এর নামে ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার অধিগ্রহণের অভিযোগ আনা হয়। এই মামলায় সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনসহ মোট ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় সাবেক এই রাষ্ট্রপতির পরিচয় দেওয়া হয়েছেÑ'ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি'র পরিচালক মো. শাহাবুদ্দিন'। আদালত সূত্রে এ পরিচয়ের কথা নিশ্চিত হওয়া গেছে।
মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল ওয়াহেদ, চেয়ারম্যান মিস মিরফাত আরা বেগম, এস আলম গ্রুপ ও এস আলম সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ওরফে এস আলম, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক মো. জয়নাল আবেদিন, পরিচালক আরাস্তু খান এবং পরিচালক প্রফেসর মো. নাজমুল হাসান।
২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে মামলাটি আমলে নেন। একই সঙ্গে আদালত দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) ঘটনাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর তারিখ নির্ধারণ করে দেন।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সর্বশেষ গত ২৩ জুন দিন নির্ধারণ ছিল। তবে ওই দিনও তদন্ত সংস্থা দুদক কোনো প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মো. আলমগীরের আদালত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১১ আগস্ট নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
বিভিন্ন সংগঠনের গ্রেফতারের দাবি
এদিকে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপি সদস্যসচিব আখতার হোসেন সাহাবুদ্দিনের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করেছেন। এছাড়া সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর ইনকিলাব মঞ্চ মিছিল বের করে। সেখান থেকে তাকে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানানো হয়। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও তার গ্রেপ্তারের আহ্বান জানিয়েছে।