ভঙ্গুর অর্থনীতি পুরোপুরি স্থিতিশীল করতে দুই বছর সময় লাগবে : অর্থমন্ত্রী

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি খাতের আয়কর কাঠামোতে বড় বৈষম্য দেখা গেছে বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। তারা বলেছে, নতুন করকাঠামোয় তুলনামূলক কম আয়ের মানুষের ওপর করের বোঝা বেশি বাড়ছে। কিন্তু ৩০ লাখ টাকার বেশি বার্ষিক আয় করা উচ্চবিত্তদের ক্ষেত্রে এই করের দায় বৃদ্ধির হার তুলনামূলক অনেক কম।

গতকাল রোববার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে আয়োজিত বাজেট পর্যালোচনা নিয়ে সংলাপ অনুষ্ঠানে এ কথা বলে সিপিডি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসবে আছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জুনায়েদ সাকি)। সম্মানিত অতিথি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ, বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।

সংলাপে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুরোপুরি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনতে সরকারের অন্তত দুই বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সার্বিক যে পরিস্থিতি, তাতে আমাদের দুই বছর সময় দিতে হবে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমরা মনে করি, দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থা থেকে স্থিতিশীলতার দিকে যাবে। তৃতীয় বছর থেকে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে।

দেশের বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতিকে প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমি তো তিন মাসে এসব সমস্যা সমাধান করতে পারব না। টাকা দিয়েও এত দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান হবে না। বিগত সরকার গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ না নিলেও বর্তমান সরকার তা শুরু করেছে। তবে বাইরে থেকে গ্যাস এনে সংরক্ষণ করে সরবরাহ করতে অন্তত ১৮ মাস সময় লাগবে।’

২০৪১ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘গ্যাস, বিদ্যুৎ ও শক্তিশালী ইন্টারনেট ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমরা এই তিন জায়গায় বিনিয়োগ করছি।’

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাজেট ও নির্দিষ্ট সময়সীমা কেন ধরে রাখা যাচ্ছে না, সেসব সুনির্দিষ্ট সমস্যা ও সেগুলোর সমাধান নিয়ে বর্তমানে কাজ চলছে। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা বা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে।

ঘোষিত নতুন বাজেটকে দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘অবাস্তব’ ও ‘ঘাটতি ও ঋণনির্ভর’ বলে উল্লেখ করেন এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। এ ছাড়া বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তার একটি স্বচ্ছ হিসাব যেন সময়ানুযায়ী সংসদ ও জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সাধারণ মানুষের কাছে ঋণ এখন বিনিয়োগের মাধ্যম নয়, বরং টিকে থাকা বা বেঁচে থাকার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো খাদ্য বা ভোগ কমিয়ে দিচ্ছে, চিকিৎসাসেবা নেওয়া পিছিয়ে দিচ্ছে, একসঙ্গে একাধিক চাকরি বা কাজ করছে। ফলে তাদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার মতো নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় তিনটি বড় সংকট দেখা যাচ্ছে। এক. কর্মসংস্থানের সংকট। দুই. বিনিয়োগের সংকট। তিন. শিক্ষার গুণগত মানের সংকট।

র‌্যাপিড চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, ‘র‌্যাপিড প্রাক্কলন করে দেখেছে যে দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ মানুষ বর্তমানে দেশের মোট সম্পদের প্রায় ৫০ শতাংশের ধারক। অর্থাৎ আমরা বৈষম্যমূলক সমাজ তৈরি করেছি, যার সংশোধন আবশ্যিক। সে জন্য যথাযথভাবে পরিকল্পিত “সম্পদ কর” ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজন।

সম্পদ বণ্টন বিবেচনার জন্য বর্তমান যে সারচার্জ ব্যবস্থা রয়েছে, সম্পদ কর আরোপের ক্ষেত্রে তা সঠিক পদ্ধতি বলে মনে করেন না এম এ রাজ্জাক। এই ক্রমবর্ধমান অসমতা মোকাবিলায় উত্তরাধিকার কর চালু করা উচিত। অন্যথায়, এসব সমস্যার সমাধান হবে না।

বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, জ্বালানিসংকটের কারণে বিদ্যমান শিল্প টিকে থাকতে পারছে না। এটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকের সুদের হার চড়া, সেটিও আরেক মাথাব্যথা। এমন বাস্তবতায় প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং বিদ্যমান শিল্পগুলো টিকিয়ে রাখাই মূল বিষয়। সে জন্য জ্বালানি হলো সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা। কিন্তু এ নিয়ে বাস্তব কর্মপরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না।

আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, ‘এখনো মব সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে আমরা এখনো নিজেদের নিরাপদ মনে করছি না। অথচ আমরা দেখতে পাচ্ছি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খুবই আত্মতুষ্ট।’

এই বাজেটে শ্রমিকদের জীবনের পরিবর্তন হয়নি বলে মন্তব্য করেন গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের রেশন দেওয়ার দাবি দাবি করা হচ্ছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তাদের যে বেতন, তাতে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে চলা সম্ভব নয়। কিন্তু বাজেটে এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

অনুষ্ঠানে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, করদাতাদের আয় বৃদ্ধির অনুপাতে করের বোঝা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যাদের বার্ষিক করযোগ্য আয় ৬ থেকে ১৫ লাখ টাকা, নতুন বাজেটে তাদের করের দায় ১২ দশমিক ৫ থেকে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। বিপরীতে ৩০ লাখ টাকার বেশি আয়কারীদের করের দায় বাড়বে মাত্র ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। এটি সামাজিক সমতা ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, ১৮ মাসে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেটে তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন নেই বলে মন্তব্য করেন ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট চার মন্ত্রণালয়ের (শ্রম, প্রবাসী কল্যাণ, শিল্প ও বাণিজ্য) বাজেট বরাদ্দ মোট ব্যয়ের তুলনায় হয় কমছে কিংবা স্থবির আছে। এ ছাড়া পটুয়াখালী ইপিজেড, জামদানি ভিলেজের মতো কর্মসংস্থানমুখী বড় প্রকল্পগুলো বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে বলে জানান তিনি।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, সুনির্দিষ্ট জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া এই বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য কেবলই ‘রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা’ হিসেবে থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

সরকার বাজেট প্রস্তাবে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বিদায়ী অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ। খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত ও বিচক্ষণ মুদ্রানীতি ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয় বলে জানান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক।