অক্সফোর্ড ইউনিয়নে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও জুলাই বিপ্লবীদের বক্তৃতা দক্ষিণ এশিয়ার ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১৪ জুন তারিখটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে সোনালী অক্ষরে লেখা থাকবে। কারণ অক্সফোর্ড ইউনিয়নের মঞ্চে ৪ জন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, অসংখ্য নোবেল বিজয়ী, বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্র নায়করা বক্তৃতা করেছেন। অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সভাপতি মুসা হিরাজ স্বাক্ষরিত একটি অফিশিয়াল আমন্ত্রণপত্র বা চিঠির মাধ্যমে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমসহ জুলাই বিপ্লবীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। চিঠিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তাঁদের “অসামান্য নেতৃত্ব ও প্রভাবশালী ভূমিকার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে এই আন্তর্জাতিক প্যানেল আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল।
এদিকে অক্সফোর্ড ইউনিয়নের এই ঐতিহাসিক প্যানেল আলোচনায় হলের ভেতরে এবং সেন্ট মাইকেলস স্ট্রিটের বাইরে উপস্থিত ছিলেন বহুসংখ্যক ব্রিটিশ-বাংলাদেশী শিক্ষাবিদ, আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ বাংলাদেশী ব্যারিস্টার বদরে আলম দিদার। তিনি বলেন, অক্সফোর্ড ইউনিয়ন কোনো সাধারণ মঞ্চ নয় যেখানে চাইলেই যে কেউ প্রবেশ করতে পারে না। এর নিজস্ব একটি অত্যন্ত কড়া প্রাতিষ্ঠানিক স্ক্রিনিং ও আমন্ত্রণ প্রক্রিয়া রয়েছে। অতীতে এই ইউনিয়ন কেবল সেই সব জনআন্দোলন বা ব্যক্তিত্বদেরই ডেকেছে, যারা বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথ আমূল বদলে দিয়েছে। যেমন আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ আন্দোলনের সময় মালকম এক্স, কিংবা আইরিশ সংকটের সময় গ্যারি অ্যাডামস। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের নেতাদের এখানে ডাকার অর্থ হলো; বিশ্বের চোখে বাংলাদেশের এই ছাত্র-জনতার আন্দোলন এখন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও বৈধ গণতান্ত্রিক লড়াই হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করল।
উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালের জুলাই রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের বীরত্বপূর্ণ বীরগাথা এবং উত্তর-বিপ্লবী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখা সরাসরি শোনার জন্য অক্সফোর্ড ইউনিয়নের বর্তমান সভাপতি মুসা হিরাজ এক আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠান। সভাপতি স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে বাংলাদেশের ছাত্রনেতা সাদিক কায়েম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, আলী আহসান জুনায়েদ ও মহিউদ্দিন খানকে তাঁদের ‘অসামান্য নেতৃত্ব ও প্রভাবশালী ভূমিকা’র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়ে এই ঐতিহাসিক প্যানেল আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। চিঠিতে পরিষ্কার উল্লেখ করা হয় যে, তরুণ সমাজ সংস্কারক ও রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে তাঁদের এই অনন্য ফিল্ড-অভিজ্ঞতা এবং তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিক মহলের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।
প্যানেল আলোচনার মূল বক্তব্যের সময় অক্সফোর্ড ইউনিয়নের হলরুমে যখন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ ডায়াসে দাঁড়ান, তখন পুরো মিলনায়তন জুড়ে ছিল পিনপতন নীরবতা। বক্তারা আন্তর্জাতিক মহলের সামনে সচিত্র তথ্যের মাধ্যমে তুলে ধরেন কীভাবে একটি সম্পূর্ণ অহিংস এবং যৌক্তিক ছাত্র আন্দোলনকে তৎকালীন সরকার নিজেদের ক্ষমতার দম্ভে বুলেট ও বন্দুকের নলে পিষে ফেলতে চেয়েছিল। তারা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেন যে, এই বিপ্লব কোনো আকস্মিক ঘটনা বা ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশক ধরে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের জনগণের ভোটাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের এক স্বতঃস্ফূর্ত জনবিস্ফোরণ।
উত্তর-বিপ্লবী বাংলাদেশের রোডম্যাপ নিয়ে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম তাঁর বক্তৃতায় নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কারের কাঠামোগত রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং ক্যাম্পাসগুলোতে দলীয় লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে কীভাবে প্রকৃত অর্থেই মেধা ও অধিকারভিত্তিক ছাত্র সংসদ সচল করা যায়, তার একটি বৈশ্বিক মডেল উপস্থাপন করেন।
নতুন প্রজন্মের বৈশ্বিক আকাক্সক্ষার বিষয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ তাঁর স্বভাবসুলভ বাগ্মিতায় বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম কেবল দেশের সীমানায় আবদ্ধ নয়। তারা একটি বৈষম্যহীন, স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। এই প্রক্রিয়ায় তারা বিশ্বের সমস্ত গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সক্রিয় ও সমমর্যাদাভিত্তিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করে।
অক্সফোর্ডের সেন্ট মাইকেলস স্ট্রিটে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ করার অপচেষ্টা: ১৪ জুন অক্সফোর্ডের সেন্ট মাইকেলস স্ট্রিটে ইউনিয়নের হলের বাইরে যা ঘটল, তা কোনো টানটান উত্তেজনার পলিটিক্যাল থ্রিলারের চেয়ে কম ছিল না। হলের ভেতরে যখন অ্যাকাডেমিক আলোচনা চলছিল, তখন বাইরে অক্সফোর্ডের শান্ত রাস্তা মুখরিত হয়ে উঠেছিল প্রায় চার শতাধিক মানুষের গগনবিদারী স্লোগানে। সেখানে বিপ্লবের সমর্থক একদলে ছিলেন জুলাই বিপ্লবের সমর্থক, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইনকিলাব মঞ্চ এবং সাধারণ প্রবাসী বাংলাদেশি তরুণ সমাজ। তারা ব্যানার-ফেস্টুন হাতে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ও চব্বিশের বিপ্লবের পক্ষে গগনবিদারী স্লোগান দিয়ে হলের ভেতরের ছাত্রনেতাদের নৈতিক সমর্থন জোগাচ্ছিলেন। তবে স্ট্রিটের অপরপাশে অবস্থান নিয়েছিলেন যুক্তরাজ্য (ইউকে) আওয়ামী লীগের একদল নেতা-কর্মী লন্ডন থেকে ডাবল ডেকার রিজার্ভ বাসে করে অক্সফোর্ডে এসেছিলেন। তারা কালো পতাকা প্রদর্শন করে ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে চব্বিশের এই পরিবর্তনকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিহত করার চেষ্টা করছিলেন।
অক্সফোর্ড ইউনিয়ন ও ব্রিটিশ প্রবাসী বাংলাদেশীদের সূত্রে জানাযায়, বিশ্বের মুক্তবুদ্ধি, বিতর্ক এবং গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও প্রাচীনতম মঞ্চ গ্রেট ব্রিটেনের ‘অক্সফোর্ড ইউনিয়ন’-এর ঐতিহাসিক কক্ষে সেদিন ধ্বনিত হয়েছে ২০২৪ সালের বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের নায়কদের কণ্ঠস্বর। অক্সফোর্ড ইউনিয়ন ও অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটির যৌথ ব্যবস্থাপনায় ‘The Student-Led Uprising and the Future of Post-Revolutionary Bangladesh’ (ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থান এবং বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ) শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সাদিক কায়েম এবং হাসনাত আব্দুল্লাহরা নিজেদের উদ্যোগে কোনো স্পেস বা হলরুম ভাড়া করেননি; বরং অক্সফোর্ড ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষ নিজেই তাঁদেরকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। পুরো আয়োজনটি সফল করতে অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটি কো-অর্ডিনেশন বা সমন্বয়ক হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করেছে। তবে মূল মঞ্চটি ছিল অক্সফোর্ড ইউনিয়নের নিজস্ব ঐতিহাসিক হলরুম এবং আমন্ত্রণটি ছিল সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্রিটিশ নাগরিক ও আইটি বিশেষজ্ঞ মিয়া মুহাম্মদ তরুণ বলেন, প্যানেল আলোচনায় প্রধান বক্তা হিসেবে বাংলাদেশের চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, আকাক্সক্ষা ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর নবনির্বাচিত সহ-সভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম এবং জুলাই বিপ্লবের অন্যতম অগ্রগণ্য জাতীয় সংগঠক তথা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ।
তিনি আরও বলেন, আমার আন্তর্জাতিক রাজনীতি পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এই ঘটনাটি নিছক কোনো সাধারণ সেমিনার বা প্রথাগত আলোচনা সভা নয়। এটি মূলত দেড় হাজারেরও বেশি শহীদের রক্তে ভেজা বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রাতিষ্ঠানিক ও আন্তর্জাতিক একাডেমিক স্বীকৃতি। যে মঞ্চে একদা বিশ্ব ইতিহাস ও বৈশ্বিক রাজনীতির গতিপথ নির্ধারিত হতো, সেই অনন্য প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ডাকসুর ভিপির এই বক্তৃতা বাঙালি জাতির স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইকে এক বৈশ্বিক আইনি ও নৈতিক উচ্চতায় আসীন করেছে।
অক্সফোর্ড ইউনিয়ন বনাম অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কাঠামোগত পার্থক্য: ১৮২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘অক্সফোর্ড ইউনিয়ন’ হলো একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত বিতর্ক বা ডিবেট সংগঠন। তবে এর বৈশ্বিক প্রভাব, রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং সামাজিক মর্যাদা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও বিশ্বজুড়ে অনেক বেশি সমাদৃত। এই ইউনিয়নের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ হলো ‘স্ট্যান্ডিং কমিটি’ বা পরিচালনা পর্ষদ, যা সম্পূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ছাত্রদের ভোটে নির্বাচিত হয়। এই স্ট্যান্ডিং কমিটির নেতৃত্ব দেওয়া বা এর গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী ক্যারিয়ারের সোপান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড ম্যাকমিলান, বরিস জনসন এবং পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর মতো বিশ্বনেতারা তাঁদের ছাত্রজীবনে এই অক্সফোর্ড ইউনিয়নের পরিচালনা কমিটিতে ছিলেন এবং এখান থেকেই তাঁদের বিশ্ব রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছিল।
শতবর্ষের ইতিহাসে বিশ্বনেতা ও নোবেলজয়ীদের মিলনমেলা ও ঐতিহাসিক ডিবেটগুলো: অক্সফোর্ড ইউনিয়নের দুইশত বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাস মূলত পৃথিবীর বাক-স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াইয়েরই এক জীবন্ত দলিল। বিংশ শতাব্দী থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান সময় পর্যন্ত বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেওয়া প্রতিটি বড় বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যু এই কক্ষের চার দেয়ালে বিতর্কিত ও মূল্যায়িত হয়েছে। ১৯৩৩ সালের ঐতিহাসিক ‘কিং অ্যান্ড কান্ট্রি’ বিতর্কটি অক্সফোর্ড ইউনিয়নের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও বিতর্কিত অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ১৯৬৪ সালের ৩ ডিসেম্বর আমেরিকার বর্ণবাদবিরোধী নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অবিসংবাদিত, বজ্রকণ্ঠ নেতা মালকম এক্স এই অভিজাত ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে আসেন। তাঁর মৃত্যুর মাত্র দুই মাস আগে দেওয়া সেই ঐতিহাসিক বক্তৃতার বিষয় ছিল; ‘স্বাধীনতা রক্ষায় চরমপন্থা কি দোষণীয়?’ এই মঞ্চের গাম্ভীর্য ও গুরুত্ব কতটা গভীর, তা বোঝা যায় এখানে বক্তব্য রাখা ব্যক্তিত্বদের তালিকা দেখলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চারজন সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন, জিমি কার্টার, রোনাল্ড রিগান এবং বিল ক্লিনটন এই ইউনিয়নে এসে বিশ্ব রাজনীতির দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন। বিশেষভাবে স্মরণীয় যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন তাঁর কুখ্যাত ‘ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি’র পর জীবনের প্রথম পাবলিকলি বা প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছিলেন এই অক্সফোর্ড ইউনিয়নের মঞ্চে দাঁড়িয়েই। এছাড়া ব্রিটেনের কিংবদন্তি প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল এবং ‘আয়রন লেডি’ খ্যাত মার্গারেট থ্যাচারও বিভিন্ন সময়ে এই কক্ষকে আলোড়িত করেছেন। আমেরিকান রাজনীতির দিকপাল সিনেটর রবার্ট কেনেডি, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার, ম্যাডেলিন অলব্রাইট, জন কেরি, মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি এবং প্রগতিশীল রাজনীতির আইকন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এখানে বক্তব্য রেখেছেন।
বিজ্ঞান ও দর্শনের জগৎ থেকে এসেছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ও পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং। মানবতার সেবায় নিয়োজিত নোবেলজয়ী মাদার তেরেসা, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু এবং তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা এই মঞ্চকে বিভিন্ন সময়ে নৈতিকতার সর্বোচ্চ প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এছাড়াও আয়ারল্যান্ডের পুনর্মিলনের বিতর্কিত আন্দোলনের অগ্রনায়ক গ্যারি অ্যাডামস এবং লিবিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি (লাইভ ভিডিও স্ট্রিমের মাধ্যমে) এই কক্ষের বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফ এবং আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইও এই ঐতিহ্যবাহী ইউনিয়ন প্লাকার্ডের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের বক্তব্য পেশ করেছেন।
ব্রিটিশ ব্যারিস্টার ও ইউকে জামায়াতের মুখপাত্র আবু বকর মোল্লা বলেন, ডাকসু হলো বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ‘এপিসেন্টার’ বা মূল উৎপত্তিস্থল। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ডাকসুর ভিপি ও নেতৃবৃন্দ রাজপথে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে দেশের ইতিহাস পরিবর্তন করেছেন। ঠিক একইভাবে, চব্বিশের জুলাই বিপ্লবেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের নেতৃত্বই ছিল ফ্যাসিবাদ পতনের মূল কারিগর। ২০২৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ডাকসুর ভিপি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ছাত্রনেতা সাদিক কায়েম, যিনি জুলাই বিপ্লবের অন্যতম একজন মহানায়ক। সেই ঐতিহ্যবাহী ডাকসুর একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ ফোরামে গিয়ে কথা বলা মূলত দুই দেশের দুটি ঐতিহাসিক ছাত্র-প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার এক অনন্য মেলবন্ধন।
ব্রিটিশ বাংলাদেশী গবেষক ও সমকালীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. কামরুল হাসান বলেন, চব্বিশের আগস্টে ফ্যাসিস্ট ও জুলাই গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মহল ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ এই বিপ্লবকে ‘মৌলবাদী উত্থান’ বা ‘বিদেশী ষড়যন্ত্র’ বলে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অপচেষ্টা করেছিল। কিন্তু অক্সফোর্ড ইউনিয়নের মতো একটি সর্বোচ্চ পশ্চিমা লিবারেল অ্যাকাডেমিক প্ল্যাটফর্মে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম এবং হাসনাত আব্দুল্লাহর সশরীরে উপস্থিতি এবং যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য সেই সমস্ত আন্তর্জাতিক অপপ্রচার ও মিথ্যা ন্যারেটিভকে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে।