বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ (ডিইএন-২), চট্টগ্রাম কার্যালয়ের আওতায় পরিচালিত মেরামত ও উন্নয়নকাজে অনিয়ম, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব বিস্তার করছেন ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারি প্রকৌশলী/কার্য্য/চট্টগ্রাম (আইডাব্লিউ) মো. আতিকুর রহমান আকন। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে, যেখানে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বর্তমানে মূল দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন। তিনি ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পানি ও পূর্ত), টাইগার পাস, চট্টগ্রাম এবং ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ওয়ার্কসপ), পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম পদেও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। একাধিক দায়িত্ব একইসঙ্গে পালনের কারণে প্রশাসনিক প্রভাব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিধি বেড়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, রেলওয়ের আবাসিক ভবন, বাংলো, অফিস ও অবকাঠামো সংস্কারকাজে একই ধরনের প্রকল্পে ব্যয়ের অস্বাভাবিক পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। নির্দিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কাজ পেলে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়। এতে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, টেন্ডার আইডি নম্বর ৮৫১০৩৬-এ চার ইউনিটের মেরামত কাজের ব্যয় ধরা হয় ৩০ লাখ টাকা; অথচ একই ধরনের আরেকটি প্রকল্পে টেন্ডার আইডি ৮৪৮০৭৮-এ প্রায় দ্বিগুণ অর্থাৎ ৬০ লাখ টাকার প্রাক্কলন করা হয়। অভিযোগকারীর ভাষ্য, পরবর্তীতে কাজটি একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দেওয়া হয়।
অভিযোগ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ : লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ এর অধীনস্থ ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারি প্রকৌশলী/কার্য্য/চট্টগ্রাম (আইডাব্লিউ) মো. আতিকুর রহমান আকনের সঙ্গে কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রচলিত রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, ফেনীতে কর্মরত থাকার সময় থেকে এই সম্পর্ক তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে তা অন্যান্য কর্মস্থলেও বহাল থাকে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সাধারণ ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হয়। এমনকি কোন কাজ কে পাবে, বিলের পরিমাণ কত হবে এবং কোন প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে-এসব ক্ষেত্রেও অনানুষ্ঠানিক প্রভাব কাজ করে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সহযোগী বলয় তৈরির অভিযোগ : অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন সেখানে নয়ন তালুকদার নামে তার পরিচিত একজনকে সঙ্গে নিয়ে কাজের বলয় তৈরি করেছেন। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ফেনীতে দায়িত্ব পালনের সময় নয়ন বিভিন্ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং পরে চট্টগ্রামেও তাকে নিয়ে আসা হয়। এতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে চাকরির সুযোগ দিতে দীর্ঘদিন কর্মরত টিএলআরদের সরিয়ে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
উপটৌকন ও সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ : অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কাজভেদে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ‘উপঢৌকন’ নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এসব অনিয়মের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য সম্পদ অর্জন হয়েছে।
অতিরিক্ত দায়িত্ব ও প্রশাসনিক প্রভাবের প্রশ্ন : অভিযোগকারী দাবি করেন, অতীতে ফেনী, লাকসাম ও কুমিল্লায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বর্তমানে চট্টগ্রাম, পাহাড়তলী ও ওয়ার্কশপ সেকশনে দায়িত্ব পালন করায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার প্রশাসনিক প্রভাব বেড়েছে। এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এককভাবে প্রভাবিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
উপটৌকনের ভাগ যায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে : অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর তদারকি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক প্রভাব রয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, বিভাগীয় পর্যায়ের কিছু সিদ্ধান্ত ও কাজ বাস্তবায়নে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আকনের কাছ উপঢৌকনের ভাগ যায় রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ (ডিইএন-২) জিসান দত্ত ও প্রধান প্রকৌশলী পূর্ব মো তানভিরুল ইসলামের কাছে।
অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য : অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত আইডাব্লিউ মো. আতিকুর রহমান আকন সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “কিছু ঠিকাদার আমার কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিতে না পেরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। আমি কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই।”
তিনি আরও দাবি করেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সব ধরনের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম প্রচলিত বিধি-বিধান অনুসরণ করে সম্পন্ন করা হয়েছে। কোনো অভিযোগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ তদন্ত করলে তিনি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবেন বলেও জানান।
রেলওয়ের অবস্থান : এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. তানভিরুল ইসলাম বলেন, “অনিয়ম-দুর্নীতির কোনো বিষয় তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনিয়ম ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কোনো ছাড় নেই।”
তিনি বলেন, অভিযোগের বিষয়ে নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করা হবে এবং তদন্তে যেটি উঠে আসবে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টির স্বচ্ছ তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।