ইবরাহীম খলিল

অকাল মৃত্যু ডেকে আনছে প্যাকেটজাত খাবার। কারণ প্যাকেটজাত পণ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে অতিরিক্তি চিনি, লবণ এবং ট্রান্সফ্যাট; যা স্বাস্থ্যের জন্য অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্যাকেটজাত খাবারে তিনটি উপাদান বেশি ব্যবহারের কারণে মানুষের মধ্যে অসংক্রামক রোগের মহামারি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং ক্যান্সারের মতো কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে ঝড়ছে বহু প্রাণ। এসব বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে প্যাকেটজাত পণ্যের মোড়কে খাদ্য ও পুষ্টি উপাদান এবং অতিরিক্ত চিনি, লবণ এবং ট্রান্সফ্যাট থাকার কথা উল্লেখ করে লেবেল দেওয়ার বাধ্যবাধকতার আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীতার কথা বলছেন তারা। যাতে জনগণ এসব বিষয়ে সচেতন হতে পারেন এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবহার করে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহণ করতে পারে।

প্যাকেটজাত খাবার নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছে বিশ^ স্বাথ্যসংস্থা। সংস্থাটির পক্ষ থেকে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসকে অকাল মৃত্যু ও বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে বলা হচ্ছে, বিশ^জুড়ে ৮০০ মিলিয়ন লোক অসংক্রামক রোগে ভূগছে। এর অন্যতম কারণ অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস।

কি শহর কি গ্রাম এখন দোকানের সামনের অংশে বিভিন্ন পাকেটজাত খাবারে ভরপুর। সাধারণ দোকান, চেইন রেস্টুরেন্ট ও পথ খাবারের স্টল দেখা যায়। টেলিভিশন ও সামাজিক মাধ্যমে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বড়দের মাঝেও জাঙ্ক ফুডের আগ্রহ তৈরি করা হচ্ছে। ফলস্বরূপ, তরুণ প্রজন্মের অনেকে সাপ্তাহিক খাদ্যতালিকায় বাড়ির খাবারের বদলে বার্গার, পিজ্জা, ফ্রাইড চিকেন, কোমল পানীয়কে জায়গা করে দিয়েছে। বাংলাদেশে এক গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া যুবকদের ৩৫% সপ্তাহে চারবারের বেশি ফাস্ট ফুড ও কার্বোনেটেড সফট ড্রিঙ্কস গ্রহণ করছে। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণেও দেখা যায় যে ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ফাস্ট ফুড বাজারমূল্য ১৩% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শহরাঞ্চলে ফাস্ট ফুডের ক্রমবর্ধমান চাহিদার ইঙ্গিত দেয়। এই ধরনের খাদ্য সাধারণত উচ্চমাত্রায় তেল-চর্বি, চিনি ও লবণসমৃদ্ধ, অথচ ভিটামিন, খনিজের পরিমাণ কম। ফলে এমন খাবার বেশি খেলে ক্যালরি বেশি পাওয়া যায় কিন্তু পুষ্টি কম পাওয়া হয়, যা ধীরে ধীরে স্থূলতা, ডায়াবেটিসের ঝুঁকিসহ অসংক্রামক রোগ সৃষ্টির ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্যাকেটজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারে অতিরিক্ত লবণ, চিনি এবং ট্রান্স ফ্যাট থাকে। নিয়মিত এসব খাবার গ্রহণ করলে হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা এবং ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। প্যাকেটজাত খাবারের প্রধান ঝুঁকিগুলো হলো যুক্ত প্যাকেটজাত খাবারে স্বাদ বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের জন্য প্রচুর লবণ ব্যবহার করা হয়, যা রক্তচাপ বাড়িয়ে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি করে। চিনির আধিক্য; কোমল পানীয়, মিষ্টি নাস্তা ও সিরিয়ালে মাত্রাতিরিক্ত চিনি থাকে, যা স্থূলতা এবং বিপাকীয় রোগের কারণ। অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও ট্রান্স ফ্যাট; প্রক্রিয়াজাত খাবারে ব্যবহৃত খারাপ ফ্যাট শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। পুষ্টির অভাব; প্যাকেটজাত খাবারে আঁশ ও প্রয়োজনীয় ভিটামিনের পরিমাণ খুবই কম থাকে। ক্ষতিকর রাসায়নিক; প্লাস্টিকের মোড়কে থাকা বিসফেনল বা অন্যান্য প্রিজারভেটিভ হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এসব স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা প্যাকেটজাত খাবারের সামনের অংশে স্পষ্ট সতর্কবার্তা চালুর পরামর্শ দিয়ে থাকে।

২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার এসব খাবার খান। অথচ বাজারে থাকা পণ্যের ৬৩ শতাংশেই রয়েছে অতিরিক্ত লবণ (সোডিয়াম), যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২৪টি ব্র্যান্ডের ৯ ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পরীক্ষা করে দেখা গেছেÑ প্রতি ১০০ গ্রাম লজেন্সে চিনি রয়েছে ৪৩ গ্রাম, যেখানে নির্ধারিত সীমা ২৫ গ্রাম। একইভাবে, ১০০ গ্রাম ডাল ভাজায় লবণ পাওয়া গেছে ৬.১ গ্রাম, যা সর্বোচ্চ সীমা ৫ গ্রাম ছাড়িয়েছে। বিস্কুট ও মিল্ক চকলেটে ট্রান্স ফ্যাট ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটের উপস্থিতিও উদ্বেগজনক।

সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে পুষ্টিগত তথ্যের ঘাটতিতে। প্রায় ৪৬ শতাংশ পণ্যে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ৩৮ শতাংশে ট্রান্স ফ্যাট এবং ২১ শতাংশে চিনি ও লবণের তথ্য নেই। কোনো প্যাকেটেই উপাদানগুলোর স্পষ্ট ও বোধগম্য পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় এক কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। বাংলাদেশেও অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকÑপ্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ হৃদ্রোগে মারা যান। মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই এসব অসংক্রামক রোগে, যার অন্যতম কারণ অনিরাপদ খাদ্যাভ্যাস।

গবেষণা সংস্থা ব্রাক এর অসংক্রামক রোগ ও পুষ্টি বিজ্ঞানী আবু আহমেদ শামীম জানান, কোন প্রসেস খাবার গুলো বিভিন্ন বয়সের লোকজন বেশি খায় সার্ভে করে প্রত্যেক ডিভিশনে শহর এবং গ্রাম্য এলাকা থেকে স্যাম্পল এনে পরিক্ষা করেছি এবং আমেরিকানদের গাইডলাইনের আলোকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এনালাইসিস করে দেখেছি লেবেলে লেখা একরকম আর ভেতরে পন্য আরেক রকম। এরকম দুটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, লেবেলে আর প্যাকেটের ভেতরের পন্য আরেক রকম পাওয়া গেছে। দেখা গেছে যে উপাদানটা বেশি থাকার কথা সেটা কম আবার যে উপাদান কম থাকার কথা সেই উপাদানটা বেশি।

বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্রান্ডের সয়াবিন তেল নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ৬৬ ভাগ তেলে ২ শতাংশের বেশি ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেছে বলেও জানান এই গবেষক। একাজটা করা হয় তেলের রঙটাকে সাদা বানানোর জন্য। যে কারণে উচ্চ তাপে রিফাইন করে।

এজন্য প্রবিধান করার ওপর গুরুত্বারোপ করে এই গবেষক বলেন, একটি কোম্পানি অনেকগুলো প্রোডাক্ট তৈরি করে। ২০টা পন্যের মধ্যে ১০টায় ফ্যাট বেশি থাকলে মানুষ ১০ কিনবে। তখন আস্তে আস্তে করে ১০ টা পন্যের উৎপাদন বাড়িয়ে দিবে। আর দশটার উৎপাদন কমিয়ে দিবে। এভাবে আস্তে আস্তে স্বাস্থ্যসম্মত খাবারে অভ্যস্ত হবে।

এবিষয়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য প্রফেসর ড. মো. শোয়েব বলেন, প্যাকেটজাত খাবারের ওপর আমরা নির্ভরতা বাড়িয়ে দিয়েছি। এক গবেষণায় দেখা গেছে ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে একবার প্যাকেজজাত খাবার খায়। আর শিশুরা সপ্তাহে ২১বার প্যাকেটজাত খাবার খায়। এসব খাবারে কোন উপাদান কি পরিমাণ আছে তার উল্লেখ নাই। গবেষণায় দেখা গেছে ৬৩ শতাংশ প্যাকেটজাত খাবারেই অতিরিক্ত লবন, চিনি এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাটের উপস্থিতি রয়েছে। প্যাকেটে যদি এসব ঘোষনা দেওয়া হবে তখন মানুষ সচেতন হবে। এবং ভাল খাবারে অভ্যস্থ হবে। আমরা দেখছি ৭১ ভাগ মানুষের মৃত্যু হয় অসংক্রামক রোগের কারণে। এর মধ্যে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ এবং ক্যান্সার অন্যতম। আর ৫০ শতাংশ মানুষের অকাল মৃত্যু হয়। আইনে বলা হয়েছে সবার দৃষ্টিগোচর হয় এমনভাবে লেবেল দিতে হবে। তবে সত্যি কথা হলো আমাদের দেশের মানুষের নৈতিকতা নেই।